কথাসাহিত্য ছোটগল্প বিশেষ সংখ্যা

আব্দুল আজিজ | কুকুর চুরির রাত | ছোটগল্প

চলুন, অলৌকিক এক রাতের গল্প শুনে আসি।

আমাদের গ্রামের, মানে কাঁসারি পাড়ার গ্রামীণ থুত্থুরে বুড়ি মহিলারা এখন আর নাই, যারা আছে তাদের বেশিরভাগই অসুখ-বিসুখে ধুঁকে ধুঁকে গরম বুকে ঠান্ডা বাতাস পুরে মরে গেছে। আর যারা দামাটে বলে পরিচিত তারা হঠাৎ স্ট্রোকে অথবা অধিক টেনশনে ডায়বেটিস পুষে ইন্তেকাল করেছেন।

একদা তারা ছিল, বিদঘুটে আকৃতির বাঁকানো বাঁশির ভেতর। এই ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতে বহু আদমখোর রাতে তলিয়ে গেছে আদম হাওয়ার সন্তানেরা।

গল্পের খাতিরে আমি প্রায় শুনেছি একটা বৃহৎ বাঁশিতে কীভাবে তারা বসবাস করে। বাঁশির ছিদ্রপথ দিয়ে তাদের প্রাণবায়ু বের হয় এটাও খুব শুনেছি। সেকেলে ধারণাগুলো তারা আর রেখে যাননি খেয়ে ফেলেছেন।

কুকুর চুরির রাত ঘটনাটা অনেক আগে ঘটে বর্ষা মৌসুমে। বয়সে অন্ধ হয়ে গেছে এমন নারী নাই যারা আমার জন্য অপেক্ষা করে বলবে এমন সব উদ্ভট কথা যা আগে আমি শুনিনি। কারণ আমার জন্মই হয়নি তখন, সহজে সে রাত প্রতারিত করেছিল সেই অন্ধ বৃদ্ধাকে। তার পেশা ছিল সুজনি কাঁথা ছাপানো, চোখ থাকাকালীন কাছে ভিতের মহিলারা সেই সুজনি কাঁথার নকশা ছাপানোর জন্য আসত বৃদ্ধার কাছে।

বাড়ি বাড়ি দুপুরের আজানের আগে ভাতের গরম মাড় সংগ্রহ করে সে নিজেই কাঁথা ছাপানোর কাজ করত। পেটের ভাত তো করতে হবে, আড়ি বেওয়া মানুষ।

বৃদ্ধা প্রথমে দিন দু-টাকার বিনিময়ে কাঠে পা দেওয়ার কাজ শুরু করে। সেটা দিন দশটাকায় পৌঁছানোর সময় কাজটা ছেড়ে দেয়, তারপর নিজে থেকেই শুরু করে কারণ কাঠে পা দেওয়ার কাজটা করতে করতে সে শিখে ফেলে সুজনি ছাপার কৌশল।
আর কঠিনই বা কি আছে?

না, সহজ বলে এখানে কিচ্ছু নাই, এখানে অঙ্ক আছে। সরলীকরণ অঙ্ক। একটু ভুল হলেই নকশা বাতিল। অবশ্য আমাদের কাঁসারি পাড়াতে তিন চারজন এই পেশাকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে নিয়েছে কিন্তু সবচেয়ে রমরমা অবস্থায় আছে একজন পুরুষ। এসব কাজ সমাজের চোখে মেয়েলি হলেও একজন পুরুষ তাদের টেক্কা দিয়ে প্রথম সারিতে বসে আছে। গ্রামের সবাই তার কাজের প্রশংসা করে, বলে ছেলেদের কাজ চিকন হয়। মেয়েদের কাজ অত চিকন পসন হয়না।
সবাই বলে লোকটি মেয়েলি স্বভাবের বলেই নাকি এই কাজে খুবই দক্ষ আর পটু। এবং তার গ্রাহক দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসে।

বৃদ্ধা, সে লোকটির কাছেই কাঠে পা দিত, লোকটি সম্পর্কে তার ভাতিজা হয়। বৃদ্ধা সকালের খাবার কালাইয়ের রুটিটা প্রায় তার কাঁথা ছাপানি ভাতিজার বাড়িতেই খেত।

আর দুপুরে নিজে দুটো ভাত রান্না করত। এসবের ফাঁকে বৃদ্ধার আরেকটি কাজ জানা ছিল, সেটি হলো মাটির চুলা বানানো। তা থেকে অবশ্য ইনকাম মন্দ হতো না।

তবে শেষকালে চোখ শুকিয়ে যাওয়ায় তার হয়েছে বিপদ। নিজে কাঁথা ছাপাচ্ছিল সেটাও বন্ধ। আর মাটির চুলা বানাতে কাদা ঘাটতে গিয়ে ঠান্ডা লেগে নিউমোনিয়া হয় সেখান থেকে অনেক কষ্টে বৃদ্ধা বেরিয়ে আসে, সেও এক ভাগ্য৷ সেই থেকে কাদা ঘাটা ছেড়ে দিয়েছে বৃদ্ধা।

হ্যাঁ, এখন তার জন্য সেই বাঁশির ছিদ্রপথগুলো তৈরি হচ্ছে, সেখান দিয়ে তাকে অতবড় দেহ নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে। সবাই আগে থেকেই কল্পনা করে কীভাবে দানব শরীর সামান্য এক ছিদ্র দিয়ে বের হবে।

যখন সবাই বাঁশির ছিদ্রপথের মুখে চলে আসে তখন মরণের ঘোরে বেঁহুশ হয়ে যায়। কল্পনাশক্তি লোপ পায়৷ দেহকে মনে হয় সরিষার সবচেয়ে ক্ষুদ্র দানাটি।

এভাবেই একটা সময় তারা হারিয়ে যায়। বাঁশি তখন আর বেজে ওঠার জন্য সাজেনা।

আসলে আমি তো আমার নানিকে দাদাকে মরতে দেখেছি, কই তারা তো বাঁশির ফুটো ব্যবহার করেনি।

আমি দেখেছি আমার দাদা প্রায় জ্বিনের সাথে লড়াই করত, তামার বিশাল হাড়ির ভেতর।
বেশিরভাগ সময় তাকে গোঁ গোঁ শব্দসহ সেই তামার হাড়ির ভেতর পাওয়া গেছে।

দাদা অবিকল মাতৃগর্ভে শিশুর অবস্থানের মতো দুই পা বুকে নিয়ে জড়োসড়ো হয়ে পড়ে থাকতো।

তখন দাদার কোনো জ্ঞান থাকত না, এ ছিল আমার দাদার জ্বিনের সাথে লড়াই করার ইতিহাস, তবে আজ অব্দি জানতে পারিনি তাদের এই যুদ্ধে কে জয়ী হয়েছে দাদা না বদ জ্বিন।

অবশ্য তাদের লড়াইয়ের সময় আমরা টের পেতাম তারপর দরজার হুড়কা ভেঙে ঘরে ঢুকে দেখতাম জ্বিন লড়াই চলা অবস্থায় দাদাকে রেখে পালিয়ে গেছে। কান্দাকাটি পড়ে যেত, সবার মুখে তখন পবিত্র কোরানের আয়াত।

এভাবেই অনেক দিন যুদ্ধ হয়ে গেছে, তাদের যুদ্ধক্ষেত্র তামার হাড়ির ভেতর।

২.

অন্ধ বৃদ্ধার কালো ছাগলটা বৃষ্টির দিন কবে নাই হয়ে যায়, কোথায় যে যায়, আল্লাই জানে।
একদিন খুব বৃষ্টি হয়েছে, যখন বৃষ্টি কেবল থেমেছে সেই সময় বৃদ্ধা তার ছাগলকে খুঁজতে বাহির হয়। এমনই এক বৃষ্টির দিনে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা হয়ে এলে বৃদ্ধা তার ছাগলকে খুঁজতে খুঁজতে আমবাগান ঘেঁটে কাঁসার কারখানার বারান্দায় থমকে দেখে, গুঁটিসুটি মেরে একটা কালো জন্তু তার ছাগলের মতোই যেন বসে আছে। সে এগিয়ে গিয়ে বলে মাগী তুই এখানে আর হামি কত আগান বাগান ঢুর্যাো পায়ের সুতা ছিড়্যা ফেলনু, আর কত কষ্ট দিবি? চল, বাড়ি চল বলে তার কান ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায়। বৃদ্ধা ভুলে গেছিল হাতে করে দড়িটা আনতে। তাই কান ধরা।

সুড়সুড় করে পেছন পেছন এসে ঘরে ছালার উপর তাকে বসিয়ে, একটা ছেঁড়া গামছা নিয়ে আসে জন্তুটার গা-গতর মুছিয়ে দেবার জন্য।

খুব সুন্দর করে ডলে ডলে গতর মুছিয়ে দেবার সময় বৃদ্ধা নিজেই নিজের সাথে কথা বলে।
সে গতর মুছিয়ে যখন মাথায় যায় হাতরে দ্যাখে শিং নাই, আরে শিং কই গ্যালো?

নামোধরে হাতড়ে গেল যদি তো সেখানেও গড়বড়, কি হল! তার ছাগলের লেজ ছোট কিন্তু কি এর লেজ বড় তার উপরে বাঁকা।

সে ভয় পেয়ে যায়। বৃদ্ধা শুনেছে কেয়ামত কাছিয়ে আসলে নাকি পশুর আকৃতি বিকৃত হয়ে যায়। আল্লাহ গো বলে কেঁদে ওঠে, সে তার ছাগলের চেয়ে কেয়ামতের ভয়ে কুঁকড়ে যায়।

তার আর ভয় কিসের যা বয়স, কেয়ামতই না হয় তার মৃত্যুর অসিলা হলো এ আর এমনকি!

বৃদ্ধা তার ছাগলের দড়ি হঠাৎ বদলে যাওয়া জন্তুর মাথায় ভরে বেঁধে রাখল দরজায়।

খুব সকালে তার বাড়িতে মানুষ জুটে গেছে, সবাই তাকে নিয়ে হাসাহাসি শুরু করে দিয়েছে। দ্যাখ দ্যাখ ছাগলের বদলে কুকুর বেঁধে রেখেছে।

আর বৃদ্ধার হারিয়ে যাওয়া ছাগলটি কাঁসার কারখানায় সারারাত কাটিয়ে সকালে বাড়ি ফিরে প্রতিবেশীদের মতো সেও চমকে ওঠে।

সেই চমকে ওঠা ছাগলটা এখন গাভিন। কি যেন একটা নাম রেখেছিল সে, ভাতিজাদের নাম রাখতে চেয়েও তো রাখতে পারেনি, ভাই-ভাবি তাকে প্রশ্রয় দেয়নি।

কিন্তু সেই সাধ নিজের ছাগলের নাম রেখে পুরণ করবে। বৃদ্ধা আরও খুশি বেশ কয়েকটা নাম খুঁজে রেখেছে, ছাগলটা বাচ্চা বিয়োলেই নামগুলো রেখে দেবে। কিন্তু আজ কেন যে খুঁজে পাচ্ছেনা। এমনি দিন তো খুঁজে পাওয়া যায়। এশারের আজান পড়াতেই সে ভয় পেয়ে বলে হায় আল্লাহ, বকরিটা হামার হারিয়ে গ্যালো নাকি। এই কানা চোখ লিয়্যা কীভাবে ঢুরব!
এই কথা জপতে জপতে ছাগল খুঁজতে নিজেকে উত্তেজিত করে তোলে।

মাথায় শাওন মাসের বৃষ্টির পানি নিয়ে ভিজতে থাকা বৃদ্ধা তার বাঁকিয়ে যাওয়া পা নিয়ে একটু একটু করে সর্বশ্রান্ত হওয়া রাতের দিকে তাকিয়ে থাকে। এটা নাকি কুকুর চুরির রাত। কিন্তু কোথাও সেই লেজ-বাঁকা জন্তুটার ডাক-হাঁক এমনকি পায়ের ছাপ অথবা গুয়ের গন্ধ নাই। যেন সেই জাতিটার অস্তিত্ব সেই বাঁশির ছিদ্রপথ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। কথিত আছে এই রাতে সকল কুকুর মরণ ঘুমে অচেতন হয়ে যায়। কে এমন নাম দিয়েছে? অন্ধকার এসে পড়লেই কত কিছু দিয়ে দেগে দেওয়া যায়।

কুকুর চুরির রাত তখনই নামে যখন কুকুরের বিপরীতে অন্য কিছু চুরি হয় বা হারিয়ে যায়। অন্ধ বৃদ্ধা, কুকুর চুরির রাতে নিজেকে হারিয়ে ফেলে, তার বাঁকানো পা, শাদা চোখ খুলে নিয়ে যাচ্ছে এমন এক শক্তি, যে কিনা সেই ছিদ্রযুক্ত বাঁশির বাহক।

আব্দুল আজিজ

জন্ম চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিখ্যাত কাঁসারি পল্লী আজাইপুর গ্রামে।
প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ দুটি : লাশপাতাল ও গঙ্গাবতী পদ্মাবতী, কাব্যগ্রন্থ : মহাযুদ্ধের পর আমাদের ইতিহাস কোন নদীর জলে ধুয়েছ।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field
    X