কথাসাহিত্য ছোটগল্প বিশেষ সংখ্যা বিশ্বসাহিত্য

সুখী মানুষ | নগিব মাহফুজ | ছোটগল্প | তর্জমা : ফজল হাসান | উৎসব সংখ্যা ১৪৩০

ভদ্রলোক যখন ঘুম থেকে জেগে ওঠেন, তখন তিনি নিজেকে সুখী মানুষ হিসেবে আবিস্কার করেন। খুব সকালে তার অভ্যাসগত মানসিক অবস্থার তুলনায় সেই আবিস্কার ছিল সবচেয়ে বেশি অদ্ভুত। তিনি সাধারণত ভয়ঙ্কর মাথা ব্যথা নিয়ে জেগে ওঠেন, হয়তো সংবাদপত্র অফিসে দেরি করে কাজ করার কারণে অথবা কোনো ধুন্ধুমার আসরে অত্যধিক খাওয়া-দাওয়া এবং শক্ত পানীয় পান করে অস্বস্তি নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য। তাকে আগের দিনের দুশ্চিন্তা এবং আজকের সমস্যা সচারচর বিরক্ত করে। তাই তিনি খুব কষ্ট করে নিজেকে বিছানা থেকে টেনে তুলে আনেন এবং তার দেহের সমস্ত শক্তি একত্রিত করে জীবনের বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আজ তিনি নিঃসন্দেহে বড্ড বেশি সুখী, আনন্দ যেন উপচে পড়ছিল। তার সেই অনুভূতি এতটাই স্বচ্ছ এবং প্রবল ছিল যে, তা যেন তার মন এবং ইন্দ্রিয়ের ওপর স্বেচ্ছায় চাপিয়ে দিয়েছে। হ্যাঁ, তিনি ভীষণ সুখী। যদি এটা সুখ না হয়, তাহলে সুখ কী জিনিস? তিনি অনুভব করেন যে, তার দেহের সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একে অপরের সঙ্গে এবং তার চারপাশের সব কিছুর সঙ্গে নিখুঁত সম্প্রীতি বজায় রেখে কাজ করে যাচ্ছে। তার মধ্যে রয়েছে অসীম শক্তি এবং অপরিসীম দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যে কোনো কিছু অর্জন করার অসাধারণ ক্ষমতা। আর আশাবাদের অপ্রতিরোধ্য অনুভূতি নিয়ে তার হৃদয় মানুষ, প্রাণী এবং অন্যান্য বস্তুর প্রতি ভালবাসায় ভরে উঠেছিল, যেন তিনি শেষ পর্যন্ত ভয়, উদ্বেগ, অসুস্থতা এবং মৃত্যুকে পরাজিত করেছেন। সব কিছু ছাড়িয়ে তার শরীর এবং আত্মায় প্রবেশ করেছিল সেই অবোধ্য স্পর্শকাতরতা, যা আনন্দ, তৃপ্তি এবং শান্তির আনন্দদায়ক সুর বাজিয়েছিল।

এই পরম আনন্দে নেশাগ্রস্ত হয়ে গভীর বিস্ময়ের সঙ্গে তিনি ধীরে ধীরে এবং উচ্ছ্বাসের রহস্যময় উৎস সম্পর্কিত অনুভূতি উপভোগ করছিলেন। তার অতীতে, এমনকি ভবিষ্যতে, বিষয়টি ব্যাখ্যা করার কিংবা ন্যায়সঙ্গত ভাবার মতো কিছুই নেই। তবে কেমন করে এলো? কতদিন স্থায়ী হবে? ওহ্ না, অনুভূতি অবশ্যই শুধু এক ধরনের চলমান মনের অবস্থা, যা কখনই স্থায়ী হতে পারে না। কারণ তা যদি চিরস্থায়ী হয়, তাহলে মানুষ স্বর্গদূত হয়ে যাবে এবং বাইরের জগতে পৌঁছাবে। সুদূর দিগন্তে এটি একটি অস্পষ্ট স্মৃতিতে পরিণত হওয়ার আগে তাকে এখন উপভোগ করতে দিন, তার সঙ্গে বাঁচতে দিন এবংতাকে রক্ষণাবেক্ষণ করুন।

তিনি ভীষণ ক্ষুধার্ত হয়ে সকালের নাস্তা খাচ্ছিলেন। তখন মাঝে মাঝে হাসিখুশি মুখে খাবার পরিবেশনকারী বুড়ো বশিরের দিকে তাকান। বৃদ্ধ লোকটি ক্রমশ বিস্মিত এবং উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠে, কারণ তার প্রভু সাধারণত আদেশ দেওয়া বা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করা ছাড়া তার দিকে এমন দৃষ্টিতে তাকান না। অতঃপর ভদ্রলোক বশিরকে বললেন:

“আমাকে বলো বশির, আমি কী সুখী মানুষ?”
বুড়ো লোকটি বিব্রত বোধ করছিল, কেননা তার মনিব প্রথমবারের মতো তাকে নরম গলায় সম্বোধন করেছে। কিছুক্ষণ অস্বস্তিকর নীরবতা কাটিয়ে সে জবাবে বলল,
“আমার মনিব আল্লাহর অশেষ দান এবং আশীর্বাদ পেয়ে খুশি।”
“তুমি কী বলতে চাও যে, আমার ভালো পদমর্যাদা, সুন্দর অ্যাপার্টমেন্ট এবং সুস্বাস্থ্যের জন্য আমি সুখী? তুমি কী তাই বলতে চাচ্ছো? কিন্তু তুমি কী সত্যি মনে করো যে, আমি একজন সুখী মানুষ?”
“আমার মনিব মানুষের ধৈর্যের সীমানা অতিক্রম করে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যান এবং প্রায়শই অন্যদের সঙ্গে উত্তপ্ত আলোচনায় রেগে যান।”

তিনি অট্টহাসি দিয়ে তাকে থামিয়ে দেন এবং বললেন,

“তোমার কী অবস্থা? তোমার কী কোনো দুশ্চিন্তা নেই?”

“অবশ্যই আছে। দুশ্চিন্তা ছাড়া কেউ বাঁচতে পারে না।”

“তুমি কী বলতে চাও যে, পরিপূর্ণ সুখ লাভ করা অসম্ভব?”

“আচ্ছা, এটাই জীবনের প্রকৃতি।” কীভাবে বশির, অথবা অন্য কেউ, তার সুখের বিস্ময়কর অবস্থা কল্পনা করতে পারে? তার সুখ অদ্ভুত এবং অনন্য কিছু, যেন তাতে পৃথিবীর সমস্ত মানুষের নিজের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রয়েছে।

তিনি সংবাদপত্র অফিসের কনফারেন্স কক্ষে দেখতে পেলেন যে, এ পৃথিবীতে তার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী একটি ম্যাগাজিনের পাতা ওল্টাচ্ছেন। লোকটি তার পায়ের আওয়াজ শুনল, কিন্তু চোখ তুলল না। কোনো সন্দেহ নেই যে, তিনি কোনো না কোনোভাবে দ্রুত তাকিয়েছেন, তবে নিজের মনের শান্তির জন্য তাকে উপেক্ষা করার চেষ্টা করেছেন। তারা নিয়মিত বৈঠকে প্রায়শই উত্তেজিত হয়ে দ্বিমত পোষণ করে এবং হাতাহাতির দ্বারপ্রান্তে না আসা পর্যন্ত আজেবাজে শব্দ বিনিময় করে। আর কেবল গত সপ্তাহেই ইউনিয়ন নির্বাচনে তিনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে লজ্জাজনকভাবে পরাজিত হয়েছেন, যা তার আত্মগরিমার জন্য প্রচণ্ড আঘাত ছিল এবং তাকে তিক্ততায় ভরিয়ে দিয়েছিল, এমনকি তার দূরদৃষ্টিকে অন্ধকার করে দিয়েছিল। কিন্তু এখানে তিনি এখন বিশুদ্ধ এবং দুর্ভাবনাহীন মন নিয়ে তার শত্রুর কাছে এসেছেন। সেই বিস্ময়কর সুখে রয়েছে ক্ষমার চোখে উপচে পড়া একধরনের নেশা এবং সহনশীলতা, যেন তিনি অন্য একজন ব্যক্তি যিনি এক নতুন বন্ধুত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। আর অদ্ভুত কোনো কিছু অনুভব না করে তিনি হাসিমুখে তাকে অভিবাদন জানান। আচমকা ঘটনায় বিস্মিত হয়ে লোকটি অবাক হয়ে চোখ তুলল এবং কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, যতক্ষণ না সে নিজেকে আস্বস্ত করতে পারে এবং সংক্ষিপ্তভাবে অভিবাদনের উত্তর দিতে পারে। সে তার চোখ এবং কানকে বিশ্বাস করতে পারেনি। ভদ্রলোক তার কাছে বসে বললেন,

“আজ সুন্দর আবহাওয়া।”

“ওহ হ্যাঁ।”

“এমন ধরনের আবহাওয়া যা মনকে গভীর সুখে পরিপূর্ণ করে দেয়। লোকটি সাবধানে এবং মনোযোগ সহকারে তার দিকে তাকায়, তারপর বিড়বিড় করে বলল,

“আমি আনন্দিত যে আপনি খুশি।”

তিনি হাসতে হাসতে বললেন,

“এই সুখ ধারণার বাইরে।”

অন্যজন দ্বিধান্বিত গলায় জবাবে বলল,

“আশা করি আজ এই সম্পাদকীয় সদস্যদের সভায় আমি আপনার মেজাজ খারাপ করব না।”

“ওহ, কখনই না। আমার মতামত সবার কাছে ভীষণ পরিচিত। কিন্তু আমি মনে কিছু করব না, যদি সদস্যরা আপনার মতামত গ্রহণ করে।”

“এক রাতেই আপনি আমূল বদলে গেছেন।”

“সত্যি বলতে কি, আজ আমি ধারণার বাইরে সুখী।”

“আমি বাজি ধরে বলতে পারি যে, চিরদিনের জন্য কানাডায় থাকার বিষয়ে আপনার ছেলে তার মন পরিবর্তন করেছে।”

তিনি হাসলেন এবং বললেন,

“না বন্ধু, সে তার সিদ্ধান্ত বদলায়নি।”

“কিন্তু তা ছিল আপনার দুঃখের প্রধান কারণ।”

“ওহ, হ্যাঁ। আমার একাকীত্ব দূর করতে এবং দেশের সেবা করার জন্য আমি তাকে ফিরে আসতে বারবার অনুরোধ করেছি। কিন্তু সে আমাকে বলেছে যে, সে একজন কানাডীয় অংশীদারের সঙ্গে প্রকৌশল ব্যবসা শুরু করতে চায় এবং এমনকি সেখানে তার সঙ্গে যোগ দেওয়ার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। তার যেখানে ইচ্ছে, সেখানেই তাকে থাকতে দিন। কিন্তু এখানে আমি—যেমনটা আপনারা দেখছেন—সুখী, অবিশ্বাস্যভাবে সুখী।

“আপনার পক্ষে এটা ভীষণ সাহসী কাজ।”

“আমি জানি না এই সুখ কি জিনিস, তবে শব্দটির পরিপূর্ণ অর্থে আমি খুশি।

হ্যাঁ, তা ছিল সুখ, সমৃদ্ধ এবং স্পর্শের মতো, অসীম শক্তির মতো দৃঢ়, বাতাসের মতো মুক্ত, অগ্নিশিখার মতো হিংস্র, ফুলের গন্ধের মতো আকর্ষণীয়। তবুও এই অস্বাভাবিক অনুভূতি চিরকাল স্থায়ী হতে পারেনি।

তার বন্ধুত্বপূর্ণ কথাবার্তায় আকৃষ্ট হয়ে সৌহার্দ্যপূর্ণভাবে অন্য লোকটি বলল,

“সত্যি, আমি সবসময় আপনাকে একজন উগ্র প্রকৃতির মানুষ হিসেবে বিবেচনা করেছি, যা আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়েছে।”

“আসলেই?”

“আপনি সমঝোতার অর্থ জানেন না। আপনি আপনার স্নায়ুর চাপ নিয়ে এবং সমগ্র সত্তার সঙ্গে কঠিনভাবে বসবাস করেন, প্রচণ্ডভাবে লড়াই করেন যেন যে কোনো সমস্যা জীবন কিংবা মৃত্যুর বিষয়।”

তিনি ধৈর্য্যের সঙ্গে সমালোচনা গ্রহণ করেন, যেন তা তার সীমাহীন সুখের সাগরে ছোট্ট এক ঢেউ। তিনি চোখেমুখে উজ্জ্বল হাসি ফুটিয়ে জিজ্ঞেস করেন,

“তাহলে আপনি বিশ্বাস করেন যে, ঘটনার প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে কিছুটা হলেও নিরপেক্ষ থাকা প্রয়োজন?”

“অবশ্যই। যেমন ধরুন গতকাল আমাদের আলোচনার বিষয় ছিল বর্ণবাদ। আমরা একই মতামত ব্যক্ত করেছি। অথচ বিষয়টি রাগান্বিত হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছানোর মতো ছিল। কিন্তু কোন ধরনের রাগ? এক অর্থে তা বুদ্ধিবৃত্তিক, বিমূর্ত ক্রোধ হওয়া উচিত। স্নায়ুকে আঘাত করার মতো, বদহজমের কারণ এবং রক্তচাপ বাড়িয়ে তোলার মতো রাগ নয়। ঠিক না?”

“এখন আমার কাছে সব স্পষ্ট হয়েছে।”

তারপরও তার হৃদয় এক বিন্দু সুখ-আনন্দ ঝরাবে না। বর্ণবাদ, ভিয়েতনাম, অ্যাঙ্গোলা, ফিলিস্তিন… কোনো সমস্যাই সুখের দুর্গে আক্রমণ করতে পারে না, যা তার হৃদয়কে ঘিরে রেখেছে। যখনই তিনি কোনো সমস্যার কথা মনে করেন, তার হৃদয় আনন্দে হাসাহাসি করে। সুতরাং বলতে গেলে তাহলো এক বিশাল সুখ, যে কোনো ধরনের দুঃখের প্রতি উদাসীন, সব সময় কষ্টের মুখে হাসিভাব। তিনি হাসতে চেয়েছিলেন, নাচতে চেয়েছিলেন, সঙ্গীত পরিবেশন করতে চেয়েছিলেন, এমনি বিশ্বের সব সমস্যার ওপরতার অসীম হাসিখুশি ভাব ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

অকস্মাৎ তার মনে হয়েছে যে, তার জন্য অফিস খুবই ছোট; তার কাজ করার কোনো আশা-আকাঙ্খা নেই। তার দৈনন্দিন কাজের বিশুদ্ধ চিন্তা-ভাবনাকে চরম উদাসীনতা এবং অবজ্ঞার সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে। তিনি তার মনকে আনন্দের স্বর্গ থেকে নামিয়ে আনতে পুরোপুরি ব্যর্থ হন। নীল নদে ডুবে যাওয়া ট্রলিবাস নিয়ে তিনি কীভাবে লিখতে পারেন, যখন তিনি এসব ভয়ানক সুখে নেশাগ্রস্ত থাকেন? হ্যাঁ, তা ছিল ভীতিকর, যা কোথাও থেকে এসেছে, অবসাদের মুহূর্তে ছিল প্রচণ্ড উগ্র এবং তার ইচ্ছাকে অবশ করেছিল। তার ওপর তখন ছিল মধ্য দুপুর। তখন নিঃশেষিত হয়ে যাওয়া ছাড়াই অনুভূতি তাকে ধারণ করেছিল। তিনি ডেস্কে তার কাগজপত্র রেখে নিজের রুমে হাঁটতে শুরু করেন, হাসতে থাকেন এবং আঙুলগুলো মটকান।

তার মধ্যে এক মুহূর্তের উদ্বেগ ছিল, যা তার ভেতর-জগতের গভীরে তলিয়ে যায়নি, বরং মনের ওপরের স্তরে এক বিমূর্ত চিন্তা হিসেবে ভেসে বেড়াচ্ছিল। ইচ্ছাকৃতভাবে সেসব চিন্তার প্রভাব পরীক্ষা করার জন্য দুঃখগুলো তার বর্তমান মানসিক অবস্থার ওপর প্রভাব ফেলেছিল, আশা করা হয়েছিল যে সেগুলো তাকে কিছুটা ভারসাম্য ফিরে পেতে সহায়তা করবে কিংবা কমপক্ষে তাকে আশ্বস্ত করবে যে, শেষ পর্যন্ত সুখ ম্লান হয়ে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, পুনরায় তিনি স্মৃতির মধ্যে তার জীবনের সমস্ত দুঃখজনক পরিস্থিতির সঙ্গে স্ত্রীর মৃত্যু নির্মাণ করেছেন। কিন্তু ঘটনাটি তার কাছে অর্থ বা প্রভাব ছাড়াই ধারাবাহিক কর্মতৎপরতা বলে মনে হয়, যেন তা প্রাচীন ইতিহাসের প্রত্যন্ত যুগে অন্য কোনো নারীর সঙ্গে ঘটেছিল, যিনি ছিলেন অন্য কোনো পুরুষের স্ত্রী। সে স্মৃতি তার ওপর মনোরম প্রভাব ফেলে, যার জন্য তিনি মৃদু হাসেন, কিন্তু শব্দ করে হাসতে পারেন না। একই ঘটনা ঘটেছিল, যখন তিনি তার ছেলের কাছ থেকে পাওয়া প্রথম চিঠির কথা স্মরণ করেন, যে চিঠিতে ছেলে কানাডায় অভিবাসনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। আর যখন তিনি বিশ্বের সমস্ত রক্তাক্ত দুঃখের ঘটনাগুলো মানসিকভাবে পুনর্বিবেচনা করতে শুরু করেছিলেন, তখন তার হাসির শব্দ এত জোরে হয়েছিল যে, অন্য অফিসে অথবা রাস্তায়ও অনায়াসে শোনা যেতে পারত। কোনো কিছুই তার সুখের অনুভূতিকে স্পর্শ করতে পারেনি। শোকের স্মৃতিরা তীরের বালিকে স্পর্শ করে হালকা ঢেউয়ের মতো নরমভাবে ভেসে বেড়াচ্ছিল। তারপর তিনি সম্পাদকীয় সভায় অনুপস্থিত থাকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা না করেই অফিস, এমনকি পুরো ভবন, ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। দুপুরের খাওয়ার সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরে তিনি ভাতঘুমের জন্য বিছানায় যান। তবে তিনি অনুভব করেন যে, তখন তার পক্ষে ঘুমানো অসম্ভব। আনন্দঘন সেই উজ্জ্বল ও উচ্ছ্বল জীবনে তার এমন কোনো ইঙ্গিত ছিল না, যা তাকে জাগিয়ে রাখতে পারে। তার অবশ্যই কিছুটা বিশ্রাম ও প্রশান্তি, কিছুটা নির্জীবতা এবং ইন্দ্রিয়ে সামান্য অসাড়তা থাকা দরকার। কিন্তু কীভাবে? অবশেষে তিনি তার বিছানা ছেড়ে অ্যাপার্টমেন্টের সামনে-পেছনে হাঁটার সময় গুণগুন করে গান গাইতে শুরু করেন। তখন তিনি নিজেকে বলেন যে, তার মানসিক অবস্থা এবং অনুভূতি যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে তিনি ঘুমাতে বা কাজ করতে কিংবা দুঃখ প্রকাশ করতে পুরোপুরি অক্ষম হয়ে পড়বেন।

ক্লাবে যাওয়ার সময় হয়েছিল, কিন্তু কোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে তার ইচ্ছে হচ্ছিল না। জনসাধারণের বিষয় কিংবা ব্যক্তিগত উদ্বেগ সম্পর্কে বন্ধুদের সঙ্গে অন্তহীন আলোচনার কোনো অর্থ নেই। এছাড়া তার বন্ধুরা যদি তাকে গুরুতর কোনো বিষয়ে হাসতে দেখে, তবে তার সম্পর্কে তারা কী ভাববে? না, তার কারো দরকার নেই; গল্প করার কোনো ইচ্ছে নেই। বরং অসাধারণ শক্তির কিছুটা হালকা করার জন্য তার পক্ষে একা বসে থাকা কিংবা কয়েক মাইল হাঁটা প্রয়োজন। যা ঘটেছে,অবশ্যই তা গভীরভাবে তার ভাবা উচিত। কেমন করে এই অসাধারণ সুখ তাকে পরাজিত করেছে? আর কতদিন তিনি এই অসহনীয় ভার বহন করতে সক্ষম হবেন? সুখের অনুভূতি কী তাকে চিরদিনের জন্য কাজ, বন্ধু-বান্ধব, ঘুম এবং মনের শান্তি থেকে বঞ্চিত করবে? তার কী সুখের কাছে নতি স্বীকার করা এবং স্রোতের সঙ্গে গা ভাসিয়ে দেওয়া উচিত? নাকি মানসিক চেষ্টা, কঠোর পরিশ্রম অথবা পেশাদার পরামর্শের মাধ্যমে পরিত্রাণ পাওয়ার পথ অনুসন্ধান করা উচিত?

তিনি প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য ডাক্তারের মুখের দিকে তাকালেন, কিন্তু ডাক্তার নিজেকে শান্ত রাখেন। তিনি কদাচিৎ তার গল্প বলা শুরু করেন। তখন ডাক্তার তার হাতের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিয়ে শান্তভাবে জিজ্ঞেস করেন,

“আপনার কী স্বতঃস্ফূর্ত, অদ্ভূত, ক্লান্তিকর ধরনের সুখ?

তিনি অবাক দৃষ্টিতে ডাক্তারের দিকে তাকান এবং কিছু একটা বলতে যাচ্ছিলেন, ঠিক সেসময় ডাক্তার তার কথার রেশ টেনে বললেন,

“এই সুখ আপনাকে কাজ করতে অক্ষম করেছে, বন্ধুদের সঙ্গ লাভ আপনাকে ক্লান্ত করে তুলেছে এবং আপনি ঘুমাতে পারছেন না। আর যখনই আপনি কোনো কষ্টের মুখোমুখি হন, তখনই আপনি হাসিতে ফেটে পড়েন।

“আপনি নিশ্চয়ই মানুষের মন পড়তে পারেন।”

“ওহ্ না, এ ধরনের কিছুই না। তবে একই ধরনের ঘটনা আমি সপ্তাহে কম পক্ষে একবার শুনি।”

“এটা কি মহামারী?”

“আমি তা বলিনি। এমনকি আমি দাবী করি না যে, এ পর্যন্ত আমি একজন রোগীর আসল কারণ সনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছি।”

“কিন্তু এটা একটা রোগ।”

“সমস্ত রোগীরা এখনো চিকিৎসার অধীনে রয়েছেন।”

“কিন্তু আপনি নিশ্চিত যে তারা সবাই অস্বাভাবিক?”

“ঠিক আছে, আমাদের চিকিৎসা ক্ষেত্রে এটি একটি প্রয়োজনীয় অনুমান।”

“আপনি কী তাদের কারো মধ্যে উন্মাদনা কিংবা মানসিক অশান্তির লক্ষণ লক্ষ্য করেছেন?” তিনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করেন। আর তারপর তিনি ভয়ে তার মাথার দিকে ইঙ্গিত করেন, কিন্তু ডাক্তার নিশ্চিতভাবে বললেন,

“না। আমি আপনাকে আশ্বস্ত করে বলছি যে, তারা সবাই শব্দের সঠিক অর্থ বোঝার জন্য বুদ্ধিমান। তবে আপনার জন্য সপ্তাহে দু’বার সাক্ষাতের প্রয়োজন আছে। আপনার দুশ্চিন্তা কিংবা দুঃখ করা উচিত নয়…

দুশ্চিন্তা, দুঃখ? তিনি হাসলেন এবং ক্রমশ তার মুখমণ্ডলে হাসি ছড়িয়ে পড়ে যতক্ষণ না তিনি অট্টহাসিতে ফেটে পড়েন। তারপর তার মনের প্রতিরোধ পুরোপুরি ভেঙে যায় এবং তিনি তার কান্না নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।

কোনো বন্ধু বা সাহায্যকারীর সহযোগিতা ছাড়া তিনি অনাবিল সুখের সান্নিধ্যে থেকেও খুবই একাকীত্ব অনুভব করেন। হঠাৎ তার মনে পড়ে রাস্তার উল্টো দিকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু তিনি কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে বিশ্বাস করেন না।

কোনো বন্ধু বা সাহায্যকারীর সহযোগিতা ছাড়া তিনি অনাবিল সুখের সান্নিধ্যে থেকেও খুবই একাকীত্ব অনুভব করেন। হঠাৎ তার মনে পড়ে রাস্তার উল্টো দিকে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের চিকিৎসা কেন্দ্র রয়েছে। কিন্তু তিনি কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে বিশ্বাস করেন না। এছাড়া তিনি ভালো করেই জানেন যে, তাদের চিকিৎসা দীর্ঘ মেয়াদী এবং তারা তার জন্য রোগীদের প্রায় সার্বক্ষণিক সঙ্গী হয়। আর তিনি অবচেতন মনে সুপ্ত স্নায়ুবিক পীড়ার অবাধ মেলামেশার পদ্ধতির কথা স্মরণ করে হাসেন। যখন তার পা তাকে ডাক্তারের অফিসে নিয়ে যাচ্ছিল, তখনো তিনি হাসছিলেন, বিশেষ করে যখন তিনি ডাক্তারকে মনোযোগী হয়ে তার সুখের অদ্ভুত অভিযোগ শোনার দৃশ্য মানসচোখে দেখতে পাচ্ছিলেন, যখন ডাক্তার সাধারণত হিস্টিরিয়া, হতাশা, উদ্বেগ বা সিজোফ্রেনিয়ার অভিযোগকারী লোকদের কথা শোনেন।

“ডাক্তার, সত্যি কথা বলতে কি, আমি আপনার কাছে এসেছি, কারণ আমি ধারণার বাইরে সুখী।”

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field
    X