গদ্য

শৈশবের কয়েক টুকরো ছবি । মূল ইয়ন ফসসে । মাসুদুজ্জামান অনূদিত গদ্যগুচ্ছ

গদ্য : শৈশবের স্মৃতিচারণ

বোধহয় চারটা বাজে

ট্রাইগভ ও আমি যখন পুরানো শস্যাগারে যাই তখন হয়তো চারটা বাজে। আমার দাদা এই শস্যাগারটি তৈরি করেছিলেন কিন্তু এখন এটি ভেঙে পড়ছে, দেয়ালের রং না করা তক্তাগুলো পচে যাচ্ছে, দেয়ালে গর্ত। সেই গর্তগুলো দিয়ে আপনি দেখতে পাচ্ছেন কিছু জায়গায় ছাদের কয়েকটা টাইলস পড়ে আছে। তিনটে টাইলস আটকে আছে কাদায়। দরজার ফ্রেমে একটা জংধরা হুক ঝুলছে। দরজাটাও দরজার ফ্রেমে আটকে আছে, খড়বাঁধা দড়িতে ঝুলছে, আঁকাবাঁকাভাবে দুলছে। উষ্ণ গ্রীষ্মের একটা দিন, বিকেল হয়েছে। ট্রাইগভে ও আমি শস্যাগার থেকে কয়েক গজ দূরে একটি বড় গোল পাথরের উপর বসে আছি। আমাদের পায়ের নীচে একটা প্লাস্টিকের ব্যাগ, যার ভিতরে আমাদের দুপুরের খাবার রয়েছে, আছে বাদামি পনিরসহ রুটির টুকরো, সেইসঙ্গে আমাদের প্রত্যেকের জন্য কোমল পানীয়। গরমে দুজনেই ঘামছি। মশকূল আমাদের মাথায় চারপাশে ভনভন করে ঘুরপাক ঘুরছে।

আমি গিটারে সুর তুলতে পারি না

আমি একেবারেই গিটারে সুর তুলতে পারছি না, অথচ এখনই নাচ শুরু হবে। ঘরটাতে ইতিমধ্যে অনেক লোক জড়ো হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই অনুষ্ঠানে সাথে জড়িত, এসেছে তাদের বন্ধু আর প্রেমিকা। লোক তো অনেক, যখন আমি আমার চোখের উপরে ঝুলন্ত লম্বা চুলের আড়াল থেকে উপরে তাকাচ্ছি তখন ঘরের চারপাশে আমি তাদের নড়াচড়া করতে দেখছি। আমি আমার গিটারের উপর ঝুকে পড়লাম, একটি টিউনিং নব ঘুরাচ্ছি তো ঘুরাচ্ছি। আমি এর পুরোটাই চারপাশে ঘুরালাম, এর তারগুলি প্রায় ফ্রেটবোর্ডের বাইরে ঝুলে আছে, পুরোটাই অসহায় নীরব। এরপর আমি নবটা উঁচু করলে উঁচুতে ওঠা সুরটা শুনতে পেলাম। নবগুলো আমি ঘোরাতেই থাকলাম, দুটি তারের ওপর ঝঙ্কার তুললাম। এখন কি সুর বেরুচ্ছে? না, কোথায় যেন থেমে যাচ্ছে, আমি আরও সুর তোলার জন্য নবগুলি ঘোরাচ্ছি তো ঘোরাচ্ছি – উপর থেকে নিচে, নিচে থেকে উপরে। ড্রামবাদক তো যতটা পারছে বাজিয়েই চলেছে। সবগুলি যন্ত্র যে বাজাচ্ছে। গিটার হাতে অন্য লোকগুলি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে বাজাচ্ছে তো বাজাচ্ছেই। কেবল আমি এই জঘন্য গিটারে সুরে তুলতে পারছি না। নবগুলি আমি আরও ঘোরালাম, তারটা ছিঁড়ে গেল। আমি আমার মাথার চুল পিছনে ধাক্কা দিয়ে সরালাম আর চিৎকার করে বললাম. আমার গিটারের তারটা তো ছিঁড়ে গেল। অন্যরা কিন্তু বাজাতেই থাকল। আমি গিটারটার বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন করে মঞ্চের পিছনে চলে গেলাম। আমার গিটার কেসে অতিরিক্ত তার আছে। একটি নতুন স্ট্রিং খুঁজে পেয়ে ছেঁড়া তারটা বদলে ফেললাম। আবার সুর না ওঠা অব্দি নবটা ঘোরালাম। ফিরে এলাম মঞ্চে। গিটারে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে বাজাতে শুরু করলাম। কিন্তু কিসের কি, আমি কিছুই শুনতে পেলাম না। আমি চিৎকার করে অন্যদের গিটার বাজানো বন্ধ করতে বললাম। থামল তারা। আমি আবার গিটারে সুর তুলতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু কিছুতেই সুর উঠল না। আমি অন্য এক গিটারিস্টকে নোট দিতে বললাম, সে তার তৃতীয় স্ট্রিংয়ে জি সুর বাজাচ্ছে। আমি নবটা ঘোরালাম।

সে বলল, আরেকটু চেষ্টা করেন।
আমি আরও একটু ঘোরালাম।. আমি অন্য গিটারিস্টদের দিকে তাকালাম এবং তারা একটু মাথা নাড়ল। আমি আরও একটু চেষ্টা করলাম। একজন আমার দিকে তাকাল, থামল, বলল, শোন।

আরেকটু উঁচুতে তোলেন, সে বলল।
আমি আরেকটু উঁচুতে তুললাম।
আরও, সে বলল।
হ্যাঁ এখন তো ঠিক ঠিক সুর উঠছে।
প্রায় হয়ে আসছে, আরেকটু উঁচুতে সুরটা তুলতে হবে, সে বলল।

আমি ঝঙ্কারটা আরও উঁচুতে তুললাম।
উঁহু, একটু নিচুতে রাখতে হবে, সে বলল।
আমি সুরটা সামান্য খাদে নামালাম।
দূর, সে বলল। পুরোটা নিচে নামান, আমাদের আবার চেষ্টা করতে হবে।
আমি নবগুলি নিচের দিকে ঘোরালাম। সে তার গিটারের তৃতীয় স্ট্রিংটা চালু করল। আমি সুরটা উঁচুতে তুললাম। মনে হলো অনেকটা হয়ে আসছে। অনেকটা। অন্য গিটারিস্টরা এবার হচ্ছে বলে মাথা নাড়ছে। আমি আরেকটু ঘোরালাম। এবার ঠিক ঠিক শোনাচ্ছে, প্রায় নিখুঁত বলা যায়।
প্রায় হয়ে আসছে, অন্য গিটারিস্টরা বলল।
আমি নবটা আরও একটু ঘোরালাম, কিন্তু এখন সুরটা বন্ধ হয়ে গেল। আমি আরও ঘোরালাম, মনে হলো হচ্ছে তো। আরও ঘোরাতে থাকলাম।
এখন সাবধান, অন্য গিটারিস্টরা বলল।
আমি কিন্তু ঘোরাতেই থাকলাম। আবার তারটা ছিঁড়ে গেল।

কী জঘন্য, আমি বলে উঠলাম।
অন্য গিটারিস্টরা বলল, আরেকটা স্ট্রিং লাগিয়ে নাও।
মঞ্চের পেছনে চলে যাও আর গিটারের কেস থেকে আরেকটা স্ট্রিং বের করে লাগাও। কিন্তু আমার তো আর কোনো স্ট্রিং নেই। আমি চিৎকার করে বললাম আমার কাছে আর কোনো স্ট্রিং নেই। আমাকে এখন একটা স্ট্রিং ধার ধার নিতে হবে। একজন গিটারিস্ট তার গিটারের কেসে গিয়ে একটি স্ট্রিং খুঁজতে থাকল। আমি দেখলাম তার একটা হাঁটু মেঝেতে আর গিটারের কেসটা চারপাশে ছড়ানো। সে আমার দিকে তাকাল।
মনে হচ্ছে আমার কাছে কোনো স্ট্রিং নেই।
সে গিটারের কেসটা হাতড়াতে থাকল। এমন ভাবে মাথা নাড়ল যে তার কাছে কোনো স্ট্রিং নেই।
নাহ্, কোনো জি-স্ট্রিং নেই, সে বলল।
আমাকে মনে হয় পাঁচটি স্ট্রিং দিয়ে বাজাতে হবে, বললাম আমি।
এইটা সম্ভবত কাজ করবে, সে বলল।
শ্রোতারাও এরই মধ্যে এখানে চলে এসেছে, আমি বললাম।
এবার আপনি ঠিকই পারবেন, সে বলল।

কুঠার

একদিন বাবা তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠল আর সে স্তূপ করা কাঠের শেডের বাইরে চলে গেল, নিয়ে এল মস্ত বড় একটা কুড়াল, সেটা সে বসার ঘরে নিয়ে এল আর তার বাবার চেয়ারের পাশে রেখে বলল, বাবা, এবার আমাকে হত্যা কর। যেমনটা হবার কথা তাই হলো, বাবা ভীষণ রেগে গেল।

(চলবে)

ইয়ন ফসসে ২০২৩ সালে নোবেল সাহিত্য পুরস্কারপ্রাপ্ত নওরেজীয় লেখক। তিনি কবিতা, উপন্যাস, নাটক নানান ধরনের লেখা লিখেছেন। সেদিক থেকে তাকে সব্যসাচী লেখক বলা যায়।

মাসুদুজ্জামান কবি, মননশীল প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। ঢাকায় থাকছেন আর ঢাকা থেকে প্রকাশিত তীরন্দাজ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field
    X