কথাসাহিত্য ছোটগল্প বিশেষ সংখ্যা

ক্যালেন্ডারে ফাঁসির ডেট | কিঞ্জল রায়চৌধুরী | ছোটগল্প

মেয়েদের সততা তাদের ঠোঁটে ফুটে ওঠে। হঠাৎ এমন একটা কথা কেন মনে হল, জানে না তনুময়। একেবারে আচমকাই যখন সে ছোট্ট হাত-আয়নাটা হাতে নিয়ে সকালের লেট আওয়ারে দাড়ি কামাচ্ছিল ঠিক সেইসময় মাথার মধ্যে ঝিলিক দিয়ে গেল কথাটা। আর সঙ্গে সঙ্গে বা তার একটু আগে বা পরে, জিলেটের ভোঁতা টার্বো ব্লেডটা যেন টার্বুলেন্টের মতোই চিরিক করে গেঁথে গেল ঠিক তার ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে! সরু চুলের মতো ক্ষতস্থানে চিলকে উঠল রক্ত – লাল আভাটা ক্রমশ মোটা হতে হতে ঘন মেরুন রঙের তরল হয়ে নেমে এল চুঁইয়ে! মাটিতে ঝরে পড়ার আগেই তনুময় জিভ দিয়ে চেটে নিল তরল-বিন্দুটা, নিজের রক্ত, লোনা তার স্বাদ…
তাড়া ছিল, ভীষণ তাড়া। জেসিকাদি অলরেডি দু-বার কল করে ফেলেছে। গ্রুপে অ্যাটেনডেন্স পাঠানোর জন্য লাগাতার মেসেজ ঢুকে চলেছে একের পর এক। কিছুটা ভয়ে, কিছুটা নার্ভাস লাগার কারণে… আর ওই ঠোঁটদুটো, হ্যাঁ জেসিকাদির ঠোঁটদুটো চোখের সামনে ভেসে উঠল বলেই কি! ঠিক ওইরকম নিখুঁত আর টানটান, অনেকটা ইংরেজি অক্ষরের মতো, রেখা দিয়ে তৈরি, স্পষ্ট আর দৃঢ়!সমস্ত সৎ মেয়েদের ঠোঁট বুঝি এমনই হয়…
এইসব ভাবনাই তনুময়কে ফোন রিসিভ করতে দিচ্ছিল না। সে ভালো করেই জানে, সুপারভাইজার হিসেবে এতক্ষণে জেসিকাদি তার অ্যাটেনডেন্সে লেটমার্ক করে আজকের দিনের জন্য অনায়াসে তাকে বসিয়ে দিতেই পারে! জেসিকাদির সেই ক্ষমতা আছে, অন্তত পক্ষে ওপর মহলের কাছে কৈফিয়ত তলব থেকে গা বাঁচিয়ে চলার অধিকার তো আছেই! তবু, নাগাড়ে দু-দুবার কল করেছে, হয়তো এটা জানার জন্যেই – ছেলেটা কোথায়? তার এই দেরির কারণটাই বা কী?
ভীষণ জ্বালা করছে ঠোঁটের কাছটায়। হাতে একেবারে সময় নেই। এমনিতেই ছাব্বিশ মিনিট লেট। স্মার্টফোনের স্মার্ট অ্যালার্ম তিন-তিনবার বেজে নিশ্চুপ। তনুময়ের ঘুম ভাঙতে দেরি হয়েছে। হবেই তো! কাল সারারাত ভরপেট খিদে নিয়ে ভালো করে ঘুম হয়নি; তন্দ্রা এল ব্রাহ্মমুহূর্তে, প্রকৃতি যখন জাগছে, তখন ঘুমের আবেশে তলিয়ে যাচ্ছিল তনুময়। আকাশে ফিনকি দিয়ে আলো ফুটছে যখন, ক্লান্তিতে আঠার মতো চিপকে গেল দুটো চোখ… তারপর ন-টা বাজতে না বাজতেই অ্যালার্মে সেট করা যান্ত্রিক পাখির কিচিরমিচির… চুঁ-চুঁ… কিঁচ কিঁচ কিঁচ! ধুত্তোরি বলে লাফিয়ে বসে দু-হাতে চুল খামচে চোখ বুজে টানা পাঁচ মিনিট বসে ছিল তনুময়। সারা মাথায় পাথরের ভার।
অবশ্য এটাই প্রথমবার নয়। মাঝমাস পার হলেই কেমন করে যেন তার এনার্জি কমে আসতে থাকে। খুচরো কয়েনের ভারে ছিঁড়ে-যাওয়া ওয়ালেটের মধ্যে, ক্রমশ ফুরিয়ে-আসা নোটগুলো যেন ক্লান্তি আর অবসাদ বাড়িয়ে তোলে। নীল নীল একশো টাকা আর সবুজ পঞ্চাশ টাকাগুলোর প্রতি বড্ড মায়া! অথচ কেউ থাকে না, থাকতে চায় না, পালিয়ে যায়। দুরন্ত গতিতে নিঃশেষ হতে থাকে… অথবা এটা তারই অক্ষমতা! সে-ই টাকা ধরে রাখতে পারে না। জেসিকাদি তা-ই তো বলে। মানে তাকে নয়, সাধারণ গড়পড়তা লোকেদের উদ্দেশ্য করে বলে। “আজকের মধ্যবিত্তরা কেউ গরিব বা বড়োলোক নয় বুঝলি তনু! টাকা ধরে রাখা আসলে একটা ক্রেডিবিলিটি, নিজের প্রতি। চেষ্টা করলেই সেটা পারা যায়।”
জেসিকাদির কথাগুলো তনুময় মন দিয়ে শোনে, চোখ দিয়ে গেলে, কিন্তু মাসের প্রথমদিকে এই কথাগুলো একেবারেই মনে থাকতে চায় না।
আচ্ছা, সে কি গরিব? নাকি বড়োলোক?
নিজেকে প্রশ্ন করেছে বহুবার। সঠিক উত্তর পায়নি। মাসের শুরুতে স্যালারি পাওয়ার মুহূর্ত থেকে টগবগ করে রক্ত ফুটতে থাকে, যেন রাজার মেজাজ!মাংস চাই। মাংসের প্রতি অদম্য লোভ তার। একটা ডবল-চিকেন রোল বা নিদেনপক্ষে এক প্লেট চিকেন কাঠিকাবাব পয়লা তারিখে সে খাবেই খাবে। মাংস ছাড়া কী করে বাঁচে মানুষ! মাংস ছাড়া ভাবতেই পারে না তনুময়। কিন্তু সমস্যা হয় যখন সে হিসেব করে দ্যাখে, তিন তারিখেই পাঁচশো টাকা বিলকুল গায়েব… লাঞ্চে মাছ থেকে ডিমের ঝোল, ডিনারে মাংস কমতে কমতে ক্রমশ রুটি সবজিতে এসে ঠেকে যায় ওই মাঝমাসেই। মদ সে রোজ খায় না, মাসের ওই প্রথম দিনে আর তার তিন দিন পর… অথচ পকেটে পয়সা না থাকলে ওই দিনগুলোর কথা ভেবে আফশোস হয়! তীব্র একটা বিষাদ যেন গ্রাস করে তাকে, তখন আরও একটা দিন সম্পূর্ণ খালি পেটে একটা ছোট্ট হুইস্কির শিশি ঢকঢক করে নিট মেরে দেয় জল-টল ছাড়াই। সেই রাতে বেজান মাংসের পুতুলের মতো শরীরটাকে ধপ করে বিছানায় এলিয়ে দিয়ে মড়ার মতো সে ঘুমায়… মাসের ছাব্বিশ তারিখে সকাল থেকে দেহ ভারী, পকেট খালি খালি, ডালভাত, আর খোসা না ছাড়ানো আলুসেদ্ধর ধ্বংসাবশেষ…

আফটার শেভ লোশান কেনার ক্ষমতা তনুময়ের নেই। ফিটকিরিই ভরসা। সেটাও শেষের মুখে। তবু ভালো করে জল দিয়ে ঠোঁট ঘষে ফিটকিরি ছোঁয়াল সে, কারেন্ট লাগার মতোই ছিটকে উঠে ‘আরিইই শুয়োরের বাচ্চা’ বলে আয়না ফিটকিরি দুটোই ফেলে দিল হাত থেকে।
বাড়িতে বড়ো আয়না নেই। হাত-আয়নাটাই যা একমাত্র ভরসা। ভেঙে গেল নাকি! না ভাঙেনি, কিন্তু ফিটকিরি গড়িয়ে নর্দমার ঝাঁঝরির মুখে দুলছে শালা আইসকিউবের মতো! দুলবে তবু গলবে না, এটাই নিশ্চিন্তির কথা, গেছে যাক। আয়নাটা আগে চাই। দু-হাতে খামচে ধরে তুলে নিল আয়নাটা, মুখের কাছে মেলে ধরে বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করল ব্যথা যতখানি জ্বলাচ্ছে, দাগ আর ততখানি নেই। ফিটকিরির ছোঁয়ায় রক্ত পড়া কমেছে, নিজের রক্ত আর কতই-বা চোষা যায়?
ক্যালেন্ডার দেখল তনুময়। আজ মাসের ছাব্বিশ তারিখ।এটা সৌভাগ্য যে, ওয়ালেটে তার সাতশো টাকা আছে। এটা অভাবনীয়! থাকার কথা নয়, ছিলও না। কাল সন্ধেবেলা হঠাৎ পাওয়া একটা পাঁচশো টাকার নোট দুর্ভাগ্যের ছাব্বিশকে ঝলমলে করে দিয়েছে। অথচ আকাশে মেঘের ভার, বৃষ্টি হয়েছে ভোররাত থেকেই। সারারাত জেগে সকালবেলায় ঘুম থেকে উঠেই বালিশের নীচ থেকে ওয়ালেটটা বার করে দেখেই ধক্ করে উঠল বুকের ভেতরটা। ভেজা ভেজা, ন্যাতানো পাঁচশো টাকার নোটখানায় গান্ধী হাসছেন, নাকি ওর ভাগ্যই ব্যঙ্গের হাসি হাসছে? ভেতর থেকে কেউ যেন বলে উঠল, এটা চুরির টাকা!
না—না— জোর করে মাথা ঝাঁকিয়ে একলা ঘরে চেঁচিয়ে বলল, মোটেই এটা চুরির টাকা নয়! প্রতিধ্বনি ছড়িয়ে নিজেরই কানে ঘুরপাক খেয়ে বেড়ায় শব্দগুলো… তার পরেই বাথরুমে ঢুকে দাড়ি কামাতে গিয়ে এমন একটা রক্তারক্তি ব্যাপার…

মোবাইল আবারও বাজছে। কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা নিয়ে জেসিকাদির নামের অক্ষরগুলো পড়তে গিয়ে জ্বালা করে উঠল দুটো চোখ। সবুজ অথবা লাল, কোনো বাটনেই আঙুল ছোঁয়াতে পারল না। কেটে গেল ফোনটা, প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ছিটকে এল মেসেজ — ‘ফোন ধরছিস না কেন তনু? শরীরটরির ঠিক আছে তো?’

জেসিকাদির জন্ম নাইন্টি নাইনে। এই সালটা কথায় কথায় বলার সময় বুক ভরে নিশ্বাস নিতে অনেকেই তাকে দেখেছে। ‘আমি শহিদের মেয়ে। কার্গিল যুদ্ধের বছরে জন্ম আমার। নামটা অবশ্য আগেই ঠিক করে রেখেছিল বাবা। আমাগো মাইয়া অইলে নাম রাখবা জেসিকা, বুঝলে আমু? আমু মানে আমিনা, আমার মা’। কথাগুলো বলতে বলতে ভরাট হয়ে উঠত জেসিকাদির কণ্ঠস্বর। চোখের চশমার ওই পারে ঝিকমিক করে উঠত চোখের দৃষ্টি। সেবছর স্বাধীনতা দিবসের ইনোভেশন প্রোগ্রামে ফার্স্ট প্রাইজ পেয়েছিল জেসিকা ব্যানার্জির টিম। নিজে হাতে ধরে সবাইকে শিখিয়েছিল কীভাবে তিনরকম বিস্কুট দিয়ে স্বাধীনতার তিন রং ফুটিয়ে তোলা যায়। সেখানেই তিন মিনিটের ছোট্ট স্পিচটা দিয়ে সব শেষে বলেছিল, “সততা মানুষকে মেরে ফেলতেও পারে, কিন্তু ডিজ্অনেস্টি জীবন্ত মানুষের গলায় ফাঁস হয়ে যায়। সুতরাং বয়েজ্ অ্যান্ড গার্লস, আমাদের মন্ত্র হোক ‘পারলে মারি, না পারলে হারি’। এটাই টার্গেট, তার বেশি বা কম কিছু নয়… ’চটাচট হাততালি পড়েছিল সেদিন। হাততালি দিয়েছিল তনুময় নিজেও।
আজ, এই মুহূর্তে, জেসিকাদির সেই কথাগুলোই তনুময়ের কানে বেজে উঠছে বার বার। নিজের হাততালির শব্দ যেন নিজেরই গালে আছড়ে আছড়ে পড়ছে।
মেসেজের কোনও উত্তর না দিয়েই শার্টপ্যান্ট গলাতে শুরু করল চটপট। বাইরে বেরোতে-না-বেরোতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। খোলা ছাতার একটা শিক বেয়ে জল গড়াচ্ছে। ওপরে একটা ফুটো, সেই ফুটো দিয়ে নেমে আসছে মরচ- ধোয়া জল। মনে পড়ল, আকাশের মড়াকান্না শুরু হয়েছে কাল থেকেই। ওই নিম্নচাপটাই যত গণ্ডগোলের মূলে। ফেরার পথে স্কুটির পেছনে বসিয়ে তাকে পৌঁছে দেবে বলেছিল জেসিকাদি। স্কুটি হু-হু করে ছুটছিল, হাওয়ার তোড়ে নেমে আসা বৃষ্টির ফোঁটা তিরের মতো বিঁধছিল দু-জনেরই গায়ে। ব্যস্ত টালিগঞ্জের মাঝরাস্তায় তখন থামারও উপায় নেই। আনোয়ার শা রোডে পৌঁছে একটু ঘুরে বাঁ-দিকের ছোটো রাস্তাটার কাছে পৌঁছেই গাড়ি সাইড করতে করতে জেসিকাদি বলল, ‘তনু, ছাতা খোল জলদি!’
চটপট স্কুটি থেকে নেমে ছাতা খুলে মেলে ধরতেই জেসিকাদি বলল, “ধুর পাগল, আমার মাথায় নয়, নিজের মাথায় দে। জ্বরে পড়লে কাল অ্যাবসেন্ট হয়ে যাবি। আমার ছাতা লাগে না, অভ্যেস আছে…” বলতে বলতে পিঠের ব্যাগ নামিয়ে চেন খুলে পার্স হাতড়াচ্ছিল জেসিকাদি। আর ঠিক সেইমুহূর্তেই অসাবধানে ব্যাগের কোনো এক অজানা ফোকর থেকে উড়ে পড়েছিল চকচকে সবুজ রঙের কাগজের মতো কিছু একটা। চিনতে ভুল করেনি তনুময়, সেকেন্ডের চেয়েও কম অবসরে ছোঁ মেরে রাস্তা থেকে তুলে সোজা পকেটে চালান করে দিয়েছিল ভিজে যাওয়া পাঁচশো টাকার নোটটা।
জেসিকাদির চোখের চশমা তখন জলে ঝাপসা। পার্সে কিছু একটা না পেয়ে ব্যাগের ভেতর ক্রমাগত হাতড়াচ্ছে। ঠোঁট কামড়ে বিড়বিড় করছে… “কোথায় যে রাখলাম! কোথায় গেল বল তো?”
তনুময় না-বোঝার মতো করেই জানতে চেয়েছিল, “কী জেসিকাদি?”
“আরে একটা পাঁচশো টাকার নোট। আলাদা করে সরিয়ে রেখেছিলাম তোর জন্য।
“অ্যাঁ—আমার জন্য—মানে!”
“আরে তুই পরশু বললি যে, ওষুধ কেনার টাকা নেই… কাল সবে ছাব্বিশ। স্যালারি হতে তো অনেক দেরি, তাই— আচ্ছা ছাড়, কাল দেখছি।”
শক্ত কাঠের মতো আড়ষ্ট হয়ে গেল তনুময়। পকেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে শক্ত করে চেপে ধরল নোটটাকে। হাত যেন বরফের মতো জমে গেল সেখানেই। বের করে আনতে পারল না। কী করে আনবে? বলবেটা কী? ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে…
সেই দেরির বোঝা বয়ে চলেছে তনুময় সেই কাল থেকেই। দেরি আজও।
জুতোর ফাটা শুকতলায় সপসপ করছে কাদা। গত দু-দিন থেকেই জানান দিচ্ছিল জুতোর তলাটা নরম হয়ে এসেছে। ফুটো হয়ে গেল তো গেল, একেবারে আজই!
বৃষ্টির জল ফুটো ছাতা থেকে গড়িয়ে ঠোঁটের ক্ষতস্থানটা আবারও চিড়বিড় করে ওঠে। তাড়াতাড়ি একটা অটোয় উঠে বসতে না বসতেই পটাং করে ছিঁড়ে গেল কোমরের বেল্ট, একেবারে পেছন থেকে ফর্দাফাঁই। সন্তর্পণে ইন করা শার্ট বের করে আড়াল করে ফেলল তনুময়। চোখের ওপর দিয়ে পার হয়ে যাচ্ছে আজাদ হিন্দ ধাবা—কারিগর শিকে কাবাব লাগাচ্ছে, তন্দুরে ঢোকাবে আর একটু পরেই। আজ মাসের ছাব্বিশ, তবু চাইলেই মাংস খাওয়া যায়!
হোটেলটা পার হতেই তনুময়ের খেয়াল হল সে গন্তব্যের দিকে নয়, একদম উলটো রাস্তায় চলেছে। আজ ডিউটির স্পট দেওয়া হয়েছিল রানিকুঠিতে। অথচ সে চলেছে রাসবিহারীর দিকে! একটা স্টেশনারির দোকান চোখে পড়তেই তনুময় ড্রাইভারের পিঠে হাত ছোঁয়ায়— “দাদা এখানেই নামিয়ে দিন—”
ভাড়াটা কোনরকমে হাতে গুঁজে দিয়েই নেমে পড়ল, কোমরে আলগা হয়ে আসা প্যান্ট চেপে ধরেই এগোল দোকানের কাউন্টারের দিকে। ছাতা রয়ে গেল রানিং অটোর সিটেই। জুতোর শুকতলাটাও মনে হচ্ছে এক্ষুনি খুলে বেরিয়ে যাবে। কাঁচুমাচু মুখ, বেসামাল চলার ধরনে ওই দোকানদারও প্রথমে হকচকিয়ে যায়। তনুময় কাউন্টারের ওপর একটু ঝুঁকে প্রায় ফিসফিস করে বলল, “দাদা একটু দড়ি হবে?”
—দড়ি!
—এই মানে—আমার বেল্টটা একদম—এই মাঝরাস্তায় হঠাৎ-ই—
দোকানদার ব্যাপারটা বুঝে নিল সঙ্গে সঙ্গেই— “আচ্ছা আচ্ছা— বুঝেছি— তুমি এক কাজ করো, ওই ওইদিক দিয়ে ঘুরে ভেতরে চলে এসো”।
তনুময়ের সত্যিই দাঁড়াবার মতো অবস্থা নেই। সে একটা আড়াল খুঁজছিল। দোকানদার একগাছা তাল পাকানো পাটের দড়ি থেকে তার দিকে বাড়িয়ে দেয়। “দ্যাখো তো, তোমার কোমরের মাপমতো কতটা লাগে, তারপর আমি কেটে দিচ্ছি। ওই বেল্টের খোপে ঢুকিয়ে নাও”।
তনুময় দোকানের কোণ ঘেঁষে আড়াল খুঁজে নেয়। একেকটা খোপে দড়ি ঢোকানোর চেষ্টা করে… পারে না… একটার পরে অন্য খোপে ঢুকতে গিয়ে মাঝের খোপটা বাদ চলে যায়… আবার খোলে, আবার জড়ায়… দড়ির সাথে জড়িয়ে যাচ্ছে হাত… পেঁচিয়ে যাচ্ছে আঙুলগুলো… ফাঁসে জড়াতে জড়াতে ক্রমশ বড়ো হয়ে যাচ্ছে দড়িটা… পা কোমর পেঁচিয়ে ক্রমশ উঠে আসছে গলা লক্ষ্য করে… সে হাঁটু মুড়ে বসে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ওঠে!
ছুটে আসে দোকানদার… ‘আর ও কী করছে ও, আরে ও ভাই!’ আশপাশ থেকে পথচলতি লোকজন… রাস্তা থেকে ছুটে আসে পাবলিকের ভিড়…

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field
    X