গদ্য বিশেষ সংখ্যা

সংবেদনশীল অনুভূতিঋদ্ধ লেখক শেখ হাসিনা | মতিন রায়হান | গদ্য | জন্মদিন | বিশেষ সংখ্যা

বুদ্ধিদীপ্ত নেতৃত্ব ও প্রজ্ঞার মধ্য দিয়ে সময়কে শাসন করছেন শেখ হাসিনা। দেশের সীমারেখা অতিক্রম করে বিশ্বসভায়ও নিজেকে মেলে ধরেছেন অনন্য মাত্রায়। বিশ্বসমাজ ও মানব সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর গভীর সংবেদন তাঁকে পৌঁছে দিয়েছে শংসাপূর্ণ উচ্চাসনে। তাঁর স্বদেশপ্রেম, দূরদর্শী রাজনীতিভাবনা, বিশ্বভ্রাতৃত্ববোধ, প্রকৃতি-প্রতিবেশচেতনা সর্বোপরি মানবিকতা আজ বিশ্বজুড়ে নন্দিত। তিনি গৃহহীনকে দেন গৃহ, উদ্বাস্তুকে দেন মমতাপূর্ণ আশ্রয়। তাঁর চরিত্রের এসব দিক তাঁকে তাঁর বাবা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রকৃত উত্তরাধিকারী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর কঠিন দায়িত্ব পালনের মাঝেও তিনি চর্চা করেন মননশীলতার। রাজনীতিক শেখ হাসিনার আড়ালেই বাস করেন এক সংবেদনশীল লেখক, যিনি গভীর মমতা দিয়ে পাতায় পাতায় আঁকেন গণমানুষের মুখ, তুলে ধরেন সমাজের নানা অসংগতি। প্রতিনিয়ত সমস্যা সমাধানের উপায় খুঁজে ফেরেন। দেন পথ-নির্দেশনাও। আজকের লেখার প্রতিপাদ্য রাজনীতিক শেখ হাসিনা নন, আমাদের অন্বিষ্ট লেখক শেখ হাসিনা অর্থাৎ শেখ হাসিনার লেখকসত্তার অন্বেষণ।

শেখ হাসিনা মূলত প্রবন্ধ লেখেন। তাঁর প্রবন্ধের বিষয় জীবন-জগৎ-মানুষ আর রাজনীতি। এ পর্যন্ত তাঁর কাছ থেকে আমরা ২৪/২৫টি মৌলিক গ্রন্থ পেয়েছি। মূলত তিন ধরনের লেখার সঙ্গে তিনি যুক্ত। প্রথমত, স্মৃতিচারণমূলক রচনা। যেমন : শেখ মুজিব আমার পিতা, আমাদের ছোট রাসেল সোনা, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জনক আমার নেতা আমার, সবুজ মাঠ পেরিয়ে, লিভিং ইন টিয়ারস ও শেখ ফজিলাতুন নেছা আমার মা ইত্যাদি। দ্বিতীয়ত, রাজনীতিনির্ভর রচনা। যেমন : বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম, সামরিকতন্ত্র বনাম গণতন্ত্র, বিপন্ন গণতন্ত্র : লাঞ্ছিত মানবতা ইত্যাদি। তৃতীয়ত, সমাজভাবনা-নির্ভর রচনা। যেমন : ওরা টোকাই কেন, সহে না মানবতার অবমাননা, সাদা কালো, দারিদ্র্য দূরীকরণ : কিছু চিন্তাভাবনা, বৃহৎ জনগোষ্ঠীর জন্যে উন্নয়ন ইত্যাদি। এছাড়া শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র ১ম ও ২য় খণ্ড ও নির্বাচিত প্রবন্ধও প্রকাশিত হয়েছে।

শেখ হাসিনার লেখা প্রথম বই ‘ওরা টোকাই কেন’। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল আগামী প্রকাশনী থেকে, ১৯৮৯ সালে। ১৯৮১ সালের ১৭ই মে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর তিনি দেখেন দেশ স্বৈরতন্ত্রের হাতে বন্দি। দারিদ্র্যের কষাঘাতে জনজীবন বিপন্ন। বিপন্ন গণতন্ত্র, লাঞ্ছিত মানবতা। দেশের মানুষ সমস্যা-সঙ্কটের ঘূর্ণাবর্তে মজ্জমান। মানুষের এমন দুর্দশা দেখে তাঁর মন কাঁদে। পঁচাত্তরে স্বজন হারানোর দুঃসহ কষ্টের সঙ্গে একাকার হয়ে যায় স্বদেশের জনমানুষের কষ্ট। তিনি এই জনযন্ত্রণা-জনকষ্টকে দূর করতে গভীর সংবেদনশীল মানুষের মতো এগিয়ে আসেন। ঘরহারা-নিরন্ন টোকাইরা কেন ‘টোকাই’ এই প্রশ্নকে সামনে রেখে শুরু করেন লেখালিখি। কী করে বাংলাদেশে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম হলো – এ প্রশ্ন নিয়েও শুরু করেন গবেষকের মতো গভীর অনুসন্ধান। বিশেষজ্ঞের মতো উন্মোচন করেন সামরিকতন্ত্রের স্বরূপ। তাঁর ভাবনার বিষয় হয়ে ওঠে জনগণ, গণতন্ত্র, দারিদ্র্য দূরীকরণ, উন্নয়ন ইত্যাদি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। মানবতার অবমাননা তাঁকে ভীষণ ব্যথিত করে। তিনি সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের উপায় খুঁজতে শুরু করেন। তাঁর রাজনীতি হয়ে ওঠে গণমানুষের জীবনকেন্দ্রিক অর্থাৎ তৃণমূললগ্ন। পিতা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা তাঁর অসাধারণ দুটি বই : ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ ও ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান : জনক আমার নেতা আমার’। পিতার সঙ্গে কন্যার নানা স্মৃতিনির্ভর এই বই দুটি এককথায় অনন্যসাধারণ রচনা। প্রথম বইটি খুব বেশি স্মৃতিলগ্ন হলেও পরেরটিতে স্মৃতির সঙ্গে জীবনবোধের নানা চিত্র অভিব্যক্ত হয়েছে। জনক কী করে হয়ে উঠলেন তাঁর প্রিয় নেতা – এর অনুপুঙ্খ বিশ্লেষণ আছে এ বইয়ের পাতায় পাতায়। ‘সবুজ মাঠ পেরিয়ে’ বইটি তাঁর কারাগারে বসে লেখা প্রবন্ধগ্রন্থ। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বন্দি হয়ে নিঃসঙ্গ কারাগারে ৩৩১ দিন কেটেছিল তাঁর দুঃসহ যন্ত্রণায়। যন্ত্রণাদগ্ধ সময়ের দলিল এই গ্রন্থ। ‘আমাদের রাসেল সোনা’ শীর্ষক বইটি পঁচাত্তরে হারিয়ে ফেলা প্রিয় ছোটো ভাইটির প্রতি তাঁর ভালোবাসার, মমত্বের, হৃদয়মথিত করা আলেখ্য। এ বই পাঠে চোখ হয়ে ওঠে অশ্রুসজল; হৃদয়ে ভর করে পাষাণভার।

শেখ হাসিনার রচনাকর্ম সম্পর্কে ড. রাশিদ আসকারী বলেন : ‘তাঁর রচনায় শিল্পের জন্য শিল্প না খুঁজে জীবনের জন্য শিল্প, কিংবা সমাজ ও জাতির জন্য শিল্প খুঁজে পাবার সুযোগ বেশি। উদারনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, আন্তরিক প্রকাশভঙ্গি ও প্রাঞ্জল গদ্যে তিনি তুলে ধরেন স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের কথা, দেশপ্রেম ও আত্মপ্রতিষ্ঠার গল্প ও সামাজিক উন্নয়নের রেসিপি। সৃজনশীল গদ্যে পরিবেশিত তাঁর রচনাসম্ভার সকল শ্রেণির পাঠকের মনে আবেদন জাগায়।’

কীভাবে গড়ে উঠলো শেখ হাসিনার লেখকসত্তা? নিঃসঙ্কোচে বলতে পারি, সাহিত্যের প্রতি প্রবল অনুরাগ আর প্রাগ্রসর রাজনীতি-ভাবনা তাঁর লেখকসত্তা তৈরির মূল প্রণোদনা। শেখ হাসিনার নিজের লেখায়ও এ-কথা উঠে এসেছে। তাঁর ভাষায় :

‘বই পড়ার অভ্যাস আমার শৈশব-কৈশোর থেকে এবং সাহিত্য নিয়ে লেখাপড়া করায় আমি এ-ভুবনে একজন মুগ্ধ অনুরাগী শুধু। কোনো দিন নিজে লিখব, একথা ভাবিনি। রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম আমার। পিতা জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শের মধ্য দিয়ে বড় হয়েছি। একদিন যে আমাকেও তাঁর মতো রাজনৈতিক নেতৃত্ব দিয়ে দেশ পরিচালনা করতে হবে ভাবিনি। সময়ের দাবি আমাকে এখানে এনে দাঁড় করিয়েছে। পিতার স্বপ্ন ছিল বাংলার দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো। আমি এই আদর্শ নিয়ে বিগত ২৮ বছর যাবৎ জনগণের সেবক হিসেবে রাজনীতি করে যাচ্ছি। আমার এই দীর্ঘ জীবনের স্মৃতি অভিজ্ঞতা ও ভিশনকে সামনে রেখেই এই লেখাগুলো তৈরি করেছি। আমার চারপাশে দেখা ঘটনা, মানুষের স্বপ্ন ও জীবনকে আমি যেভাবে দেখেছি এবং জেনেছি তাই লেখার মাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি মাত্র। এগুলোর পাঠকমূল্য পাঠকই বিবেচনা করবেন। আমি লেখার মাধ্যমে পাঠকের কাছাকাছি যাবার চেষ্টা করেছি।’

তাঁর এই স্বীকারোক্তির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কী করে তিনি ‘লেখক’ হয়ে উঠলেন। শেখ হাসিনার ‘ওরা টোকাই কেন’ বইটির ভূমিকা লিখেছেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। তিনি শেখ হাসিনার লেখাকে ‘স্বতঃস্ফূর্ত লেখা’ বলে আখ্যা দিয়ে তাঁকে অভিনন্দিত করেছেন। আরেক জাতীয় অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম শেখ হাসিনার লেখার প্রশংসা করে তাঁকে ‘জাত লেখক’ বলে অভিহিত করেছেন। দুজন শিক্ষকের কাছ থেকে এমন প্রশংসা যাঁর ভাগ্যে জোটে, তাঁর লেখকসত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা সত্যি অবান্তর।

‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ শীর্ষক গ্রন্থের ভূমিকায় শেখ হাসিনার সরাসরি শিক্ষক ড. রফিকুল ইসলাম বলেন : ‘শেখ হাসিনা সঙ্গত কারণেই রাজনীতিকরূপেই অধিকতর পরিচিত, কিন্তু লেখিকারূপেও শেখ হাসিনার অবদান যে উপেক্ষণীয় নয় তার কারণ শেখ হাসিনার লেখা কোনো শৌখিন ব্যাপার বা অবসর বিনোদনের জন্যে নয়। পঁচাত্তর থেকে পঁচানব্বই দুই দশক তিনি যে দুঃসময় অতিক্রম করেছেন সে সময় লেখনী ধারণ সহজসাধ্য ছিল না। তবুও যে তিনি না লিখে পারেননি তার কারণ দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা, যা তিনি পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে এবং পঁচাত্তর-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পৃক্ততা থেকে। ‘শেখ মুজিব আমার পিতা’ গ্রন্থে সংকলিত প্রবন্ধাবলি, যা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় বা সংকলনে প্রকাশিত হয়েছিল, তা থেকে একজন গভীর সংবেদনশীল লেখিকার অন্তর্দৃষ্টি এবং সচেতন মন-মানসিকতার পরিচয় মেলে, যা গতানুগতিক রাজনৈতিক সাহিত্যে সচরাচর পাওয়া যায় না।’
ড. রফিকুল ইসলামের এই অভিমত বিশ্লেষণ করলেই শেখ হাসিনার লেখকসত্তার স্বরূপ ও প্রাসঙ্গিকতা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

শেখ হাসিনার নিজের লেখাতেও উপরিউক্ত বক্তব্যের প্রতিধ্বনি মেলে। তাঁর ভাষায় : ‘আমার লেখায় এই দেশের মানুষকে ঘিরে মানুষের কথা বলতে চাই। তাদের সুখ-দুঃখ, তাদের জীবনযাত্রা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। এই দেশের মানুষের জন্যই আমার আব্বা জীবন দিয়ে গেছেন। কাজেই তাদের জন্য কিছু করাই আমার কর্তব্য। তাই আমার লেখায় উঠে আসে মানুষের কথা। আর সব লেখায় প্রায় একই কথা বারবার চলে আসে, তার কারণ হল আমার অনুভূতি। যাদের নিয়ে ভাবি, যাদের কথা বলতে চাই, তাদের কথাই বারবার এসে যায়। হয়তো পড়তে পড়তে মনে হতে পারে একই কথা কেন বলি। আসলে যতদিন এদেশের দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে না পারব, দারিদ্র্যের কষাঘাত থেকে মানুষকে মুক্ত করতে না পারব ততদিন বারবার এদেশের মানুষের কথা চলে আসবে।’

শেখ হাসিনার লেখার ভাষা কেমন, সেটা বুঝতে তাঁর লেখা থেকে দুয়েকটি উদ্ধৃতি তুলে ধরা প্রাসঙ্গিক বিবেচনা করছি। ‘ওরা টোকাই কেন’ গ্রন্থের প্রথম লেখা ‘স্মৃতির দখিন দুয়ার’। সেই রচনাটিতে কাব্যময় গদ্যে গ্রামজীবনের স্মৃতির গ্রন্থনা করেছেন এভাবে : ‘আমার শৈশবের স্বপ্ন-রঙিন দিনগুলো কেটেছে গ্রাম-বাংলার নরম পলিমাটিতে, বর্ষার কাদা-পানিতে, শীতের মিষ্টি রোদ্দুরে, ঘাসফুল আর পাতায় পাতায় শিশিরের ঘ্রাণ নিয়ে, জোনাক-জ¦লা অন্ধকারে ঝিঁঝির ডাক শুনে, তাল-তমালের ঝোপে বৈঁচি, দীঘির শাপলা আর শিউলি-বকুল কুড়িয়ে মালা গেঁথে, ধুলোমাটি মেখে, বর্ষায় ভিজে খেলা করে।’

কী চমৎকার কাব্যময় বর্ণনা! শেখ হাসিনার শৈশব-কৈশোরের এই বৃত্তান্ত আবহমান গ্রামবাংলাকেই যেন চোখের সামনে মেলে ধরে।

তিনি যখন ২০০৭ সালে কারাবন্দি হন তখন তাঁর দিনগুলো ভীষণ নিঃসঙ্গতায় কাটে। এই একাকিত্ব ও নিঃসঙ্গতা বোধ থেকেই তাঁর হাতে রচিত হয় ‘সবুজ মাঠ পেরিয়ে’ গ্রন্থটি। সাবজেলে বসে ২০০৮ সালের ১০ই জুন তিনি লেখেন : ‘সামনে সবুজ মাঠ’। সংসদভবন এলাকার গাছে-গাছে সবুজের সমারোহ। এই সবুজেরও কত বাহার! সামনে একটা শ্বেত করবী গাছ, যার পাতা গাঢ় সবুজ। বৃষ্টিতে ভিজে যায় গাছের পাতা। কখনওবা হাওয়ায় পাতাদের ঝিরিঝিরি শব্দ শুনি। গণভবনের সেই পাখিদের কথা মনে পড়ে। তারাও এখানে উড়ে উড়ে আসে। অনেক কথা মনে পড়ে, অনেক স্মৃতি ভেসে আসে। নিঃসঙ্গ কারাগারে এই স্মৃতি আমার এখন সঙ্গী।’

সহজ-সরল কাব্যময় ভাষায় কী চমৎকার উপস্থাপনা! বাবার মতো নিরন্তর অধ্যয়ন ও শিল্প-সাহিত্য পাঠই তাঁর এমন চিত্তাকর্ষক রচনার ভিত তৈরি করে দিয়েছে। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনও বাবার কাছ থেকেই পাওয়া।

১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো তাঁর নেতৃত্বে আওয়ামী সরকার ক্ষমতাসীন হলে দারিদ্র্য বিমোচনের প্রতি তিনি সর্বাধিক গুরুত্ব দেন। দেশের ইতিহাসে এই প্রথম ‘বয়স্ক ভাতা’, ‘বিধবা ও স্বামী-পরিত্যক্তা মহিলা ভাতা’, ‘অসচ্ছল মুক্তিযোদ্ধা ভাতা’, ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’, ‘আদর্শ গ্রাম’, ‘একটি বাড়ি একটি খামার’, ‘কর্মসংস্থান ব্যাংক’সহ জনকল্যাণমূলক নানারকম প্রকল্প গ্রহণ করেন। এছাড়া গ্রামোন্নয়নেও নেন নানা পদক্ষেপ। দারিদ্র্যপীড়িত বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি ও সামগ্রিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত হচ্ছে শিক্ষা। এই উপলব্ধি থেকে ১৯৯৫ সালেই তিনি রচনা করেন ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ : কিছু চিন্তাভাবনা’ শীর্ষক গ্রন্থটি। তাঁর অর্থনৈতিক উন্নয়ন দর্শনের আড়ালে শিক্ষাভাবনা কীভাবে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলছে তার প্রমাণ মিলবে নিচের উদ্ধৃতিতে। শেখ হাসিনার ভাষায় :

‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য দূরীকরণের প্রশ্নে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ব্যর্থতা থেকে আমাদের অনেকের মনেই স্থিরবিশ্বাস জন্মেছে যে শিক্ষাহীন নিরক্ষর জাতিকে নিয়ে আমরা বেশি দূর অগ্রসর হতে পারব না। শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকীকরণ, বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি প্রযুক্তি আহরণ ও প্রয়োগ, রপ্তানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও বেকারত্ব দূরীকরণ – বস্তুত জাতিগঠন ও অথনৈতিক প্রবৃদ্ধি দ্রুততর করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিটি বিষয়ে আমাদের বিশাল নিরক্ষর জনসংখ্যা ও শিক্ষার নিম্নমান একটি বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখা দিয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকার উদাহরণ দিতে চাই না। এশিয়ার বিভিন্ন দেশের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই আমরা উপলব্ধি করতে পারি, শিক্ষার সঙ্গে উন্নয়নের গভীর ও প্রত্যক্ষ যোগসূত্র।’

বাবা শেখ মুজিবের মতোই তাঁর রাজনীতি-ভাবনার প্রধান উপলক্ষ্য জনমানুষ ও দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন।

আবার একটু পেছনে ফিরে যেতে চাই। টুঙ্গিপাড়া বাঙালি জাতির এক স্বপ্নগর্ভা গ্রাম। বঙ্গবন্ধুর জন্ম নেওয়া এ গ্রামের পল্লিপ্রকৃতি আমাদের গভীরভাবে টানে। টুঙ্গিপাড়া শেখ হাসিনারও জন্মগ্রাম। শেখ হাসিনার আবেগময় স্মৃতি-আলেখ্যে বাঙালির তীর্থভূমি টুঙ্গিপাড়া উঠে এসেছে বাঙ্ময় অনুভবে :

‘বাইগার নদী এখন টুঙ্গীপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে কুল কুল ছন্দে ঢেউ তুলে বয়ে চলেছে। রোদ ছড়ালে বা জ্যোৎস্না ঝরলে নদীর পানি রুপোর মতো ঝিকমিক করে। … নদীর পাড় ঘেঁষে কাশবন, ধান-পাট-আখ ক্ষেত, সারিসারি খেজুর, তাল-নারকেল-আমলকী গাছ, বাঁশ-কলাগাছের ঝাড়, বুনো লতাপাতার জংলা, সবুজ ঘন ঘাসের চিকন লম্বা লম্বা সতেজ ডগা। শালিক-চড়ুই পাখিদের কল-কাকলি, ক্লান্ত দুপুরের ঘুঘুর ডাক। সব মিলিয়ে ভীষণরকম ভালো লাগার এক টুকরো ছবি যেন। আশ্বিনের এক সোনালি রোদ্দুর ছড়ানো দুপুরে এ টুঙ্গীপাড়া গ্রামে আমার জন্ম। গ্রামের ছায়ায় ঘেরা, মায়ায় ভরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও শান্ত নিরিবিলি পরিবেশ এবং সরল-সাধারণ জীবনের মাধুর্যের মধ্য দিয়ে আমি বড় হয়ে উঠি।’

শেখ হাসিনার সৃজনশীল লেখকসত্তার একটি উল্লেখযোগ্য দিক তাঁর সম্পাদনাকর্ম। ভাষা আন্দোলন থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সকল রাজনৈতিক সংগ্রামের বস্তুনিষ্ঠ তথ্য ও ইতিহাসনির্ভর গ্রন্থ অসমাপ্ত আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা ও আমার দেখা নয়াচীন-এর পাণ্ডুলিপি নিখুঁতভাবে সম্পাদনা করা ও প্রাসঙ্গিক ভূমিকা রচনা তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার স্মারক। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র পাণ্ডুলিপি প্রস্তুতকালে কী আবেগঘন অনুভূতির মধ্য দিয়ে তাঁর সময় গেছে সেটা উঠে এসেছে তাঁর লেখা বইটির ভূমিকায়। সম্পাদক শেখ হাসিনার ভাষায় : ‘আব্বার হাতে লেখা চারখানা খাতা। অত্যন্ত সতর্কতার সাথে খাতাগুলো নাড়াচাড়া করতে হয়েছে। খাতাগুলোর পাতা হলুদ, জীর্ণ ও খুবই নরম হয়ে গেছে। অনেক জায়গায় লেখাগুলো এত ঝাপসা যে পড়া খুবই কঠিন। একটা খাতার মাঝখানের কয়েকটা পাতা একেবারেই নষ্ট, পাঠোদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন। পরদিন আমি, বেবী মওদুদ ও রেহানা কাজ শুরু কললাম। রেহানা খুব ভেঙে পড়ে যখন খাতাগুলো পড়তে চেষ্টা করে। ওর কান্না বাঁধ মানে না। প্রথম কয়েক মাস আমারও এমন হয়েছিল যখন স্মৃতিকথা ও ডায়েরি নিয়ে কাজ শুরু করেছিলাম। ধীরে ধীরে মনকে শক্ত করেছি। প্রথমে খাতাগুলো ফটোকপি করলাম। … এরপর মূল খাতা থেকে আমি ও বেবী পালা করে রিডিং পড়েছি আর মনিরুন নেছা নিনু কম্পোজ করেছে। … সময় বাঁচাতে এই ব্যবস্থা।’

এছাড়া বঙ্গবন্ধুর ওপর ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত তৈরি পাকিস্তান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্ট ‘সিক্রেট ডকুমেন্টস অব ইন্টিলিজেন্স ব্রাঞ্চ অন ফাদার অব দ্য নেশন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’ সম্পাদনাও তাঁর দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক। কারণ ১৪ খণ্ডে সমাপ্ত এই দলিল ইতিহাসের অনেক সত্যকে আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে। বাংলাদেশের ইতিহাসপাঠ, চর্চা ও গবেষণায় উন্মোচন করেছে নতুন দিগন্ত। উপরিউক্ত গ্রন্থসমূহ ছাড়াও শেখ হাসিনা সম্পাদনা করেছেন আরও বেশ কিছু গ্রন্থ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে : ‘আমার স্বপ্ন আমার সংগ্রাম’, বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’, ‘বাংলা আমার আমি বাংলার’ , ‘বিশ্বপ্রামাণ্য ঐতিহ্যে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ’ ইত্যাদি। অবাক করার মতো বিষয় হচ্ছে রাজনীতিক ও লেখক শেখ হাসিনার জন্ম, বেড়ে ওঠা ও তাঁর কর্মময় বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে ইতোমধ্যে রচিত হয়েছে শতাধিক বই। আর তাঁকে নিয়ে সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যাও ষাট অতিক্রম করেছে।

শত ব্যস্ততার মধ্যেও শেখ হাসিনা লিখছেন – এটি তাঁর দৃঢ় অভীপ্সা, মেধা ও প্রজ্ঞার পরিচায়ক তো বটেই, পাশাপাশি আমাদের কাছেও আনন্দের উপলক্ষ্য। তিনি জীবনের শেষ দিনগুলো কাটাতে চান তাঁর প্রিয় টুঙ্গিপাড়ায় এবং লেখালেখিও করতে চান গভীর নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সঙ্গে। তাঁর এই মাঙ্গলিক প্রয়াস ফলপ্রসূ হোক, এটাই আমাদের একান্ত প্রত্যাশা।

তথ্যসূত্র

১. ‘শেখ হাসিনা : বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতার আলোয়’, রাশিদ আসকারী, ৭৫তম জন্মদিনের শুভেচ্ছা শেখ হাসিনার সৃষ্টিশীলতা, (সম্পা.) মুহম্মদ নূরুল হুদা, বাংলা একাডেমি।
২. শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র ১, শেখ হাসিনা, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৪, পৃ. ১৭
৩. শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র ১, শেখ হাসিনা, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৪, ভূমিকা দ্রষ্টব্য
৪. শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র ১, শেখ হাসিনা, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৪, ভূমিকা দ্রষ্টব্য
৫. ওরা টোকাই কেন, শেখ হাসিনা, আগামী প্রকাশনী, ২০১৬, পৃ. ১০
৬. সবুজ মাঠ পেরিয়ে, শেখ হাসিনা, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১১, পৃ. ৩৭
৭. শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র ১, শেখ হাসিনা, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৪, পৃ. ১৭৩
৮. শেখ হাসিনা রচনাসমগ্র ১, শেখ হাসিনা, মাওলা ব্রাদার্স, ২০১৮, পৃ. ২৫-২৬
৯. অসমাপ্ত আত্মজীবনী, শেখ মুজিবুর রহমান, দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক। বাংলা একাডেমিতে কর্মরত।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field
    X