গদ্য বিশেষ সংখ্যা

পথ শুধু এগিয়ে চলার | জাফর ওয়াজেদ | জন্মদিন | গদ্য | বিশেষ সংখ্যা

দীর্ঘমেয়াদি এক লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিনি ছুটে চলেছেন দিগন্ত থেকে দিগন্তে। চার দশকের বেশি সময় ধরে অব্যাহত রেখেছেন এই লড়াই। আর এ লড়াই তিনি একাই চালিয়ে আসছেন জনমত এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে। নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে কখনো ধীরপদে, কখনো দ্রুতপায়ে তিনি অগ্রসরমান। কোনো হুমকি-ধমকি, ভয়-ভীতি, প্রলোভন তাঁকে পরাভূত করতে পারেনি। পারবে যে তেমন কোনো লক্ষণ, সম্ভাবনা পরিলক্ষিত হয়নি আজও। চড়াই-উতরাই পাড়ি দিয়ে তিনি ক্রমান্বয়ে এগিয়ে চলেছেন স্বপ্নের মনোরথে বাস্তবের পরিকাঠামো ছাড়িয়ে, সাফল্যের বিজয়গাথাকে সঙ্গে নিয়ে। পিতার মতোই গভীর দেশপ্রেম ও দুর্জয় সাহস, প্রজ্ঞা, ধৈর্য, কর্মকুশলতা, কর্মনিষ্ঠা, মেধা, মনন, দক্ষতা নিয়ে সব প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে এগিয়ে যাচ্ছেন ক্রমশ সম্মুখ পানে। মানবমুক্তির লক্ষ্যে। উদার আকাশ আর বিস্তীর্ণ প্রান্তরে দাঁড়িয়ে উদাত্ত কণ্ঠে দেশবাসীকে আহ্বান করেন যিনি কল্যাণে-মাদলে মানবতার জয়গানের আহ্বানে মুক্তির সংগ্রামে। অসাধ্যকে সাধন করে মানুষের হিতার্থে, দেশের উন্নতি ও অগ্রগতির চাকাকে বহুদূর এগিয়ে নেওয়ার ব্রত আজও অমলিন।

তিনি, শেখ হাসিনা, যাঁর বিয়াল্লিশ বছরের সক্রিয় রাজনৈতিক জীবনজুড়ে ঝঞ্ঝাক্ষুব্ধময় ঝড়ো হাওয়ার মোকাবিলা, ঘাতকের একুশ দফা হত্যা প্রচেষ্টা, চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র, নির্যাতন, জেল-জুলুম সয়ে যেতে হয়েছে। সমাবেশে গুলি, জনসভায় গ্রেনেড হামলা চালিয়ে ক্ষমতাসীনরা তাঁকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিল। বঙ্গবন্ধু, এমনকি তাঁর পরিবারকে নিশ্চিহ্ন করার যে ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত পাকিস্তান আমল থেকে চলে আসছে, তার রেশ আরও বহুগুণে প্রসারিত হয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনার কাছে তো ‘জীবন-মৃত্যু পায়ের ভৃত্য’। মৃত্যুকে তুচ্ছ করতে শিখেছেন পরিবারের সবাইকে হারিয়ে। প্রিয়জন হারানোর বেদনা মনে পোষণ করে, শোককে শক্তিতে রূপান্তরিত করে তিনি চার দশকের বেশি সময় ধরেই সাহস, দৃঢ়তা, একাত্মতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, কর্মকুশলতায় নিজেকে সম্পূর্ণভাবে তুলে ধরে পিতৃস্থানপূরণে অনির্বার পদক্ষেপের পর পদক্ষেপ নিয়েছেন, নিচ্ছেন। কিন্তু সবই যে সহজে হয় বা হচ্ছে, তা তো নয়, অনেক প্রতিবন্ধকতাও আসে সামনে। সেসব ভেঙে বেরিয়ে যাওয়াই যে তাঁর ধর্ম এবং কর্ম। কোনো বিষয়ে পিছপা হননি, কোনো ভ্রুকুটিতে হাল ছাড়েননি, কোনো সিদ্ধান্তকেই বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেননি। কিন্তু এই চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজের অবদান শক্তপোক্ত শুধু নয়, অনিবার্য হিসেবে প্রতিভাত করতে পেরেছেন। কিন্তু এই যে পথ তিনি দিয়েছেন পাড়ি, তা খুব মসৃণ ছিল না। যাতে পদে পদে বাধা, অপ্রচার, কুৎসা, বিষোদ্গার, মিথ্যাচারের শিকারও হতে হয়েছে। সীমাহীন ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা বলেই প্রতিহিংসা পরায়ণতা গ্রাস করেনি। এখানেই মহত্ত্ব উঠে আসে অনায়াসে।

পুরো জীবনই তাঁর নিবেদিত বাঙালি ও এই বাংলার মানুষের জন্য। আর এজন্য তাঁকে বহুবার হতে হয়েছে মৃত্যুর মুখোমুখি। পিতা-মাতাসহ পরিবারের সদস্যদের নৃশংস হত্যার পর ঘাতকচক্র তাঁকেও বিনাশের কতশত অপচেষ্টা ও চক্রান্তই না চালিয়ে যাচ্ছে আজও। কিন্তু তিনি রয়েছেন এই বাংলার মানুষের অন্তরজুড়ে। বয়সী মানুষের কাছে তিনি তো আজও ‘শেখের বেটি’। কত গভীর মমতাবোধে মানুষ তাঁকে আপ্লুত করে, শুভাশিস জানায়। ব্যক্তিগত লোভ-লালসা নিয়ে নয়, রাজনীতি করেন জাতির পিতার আদর্শ নিয়ে। দুখী মানুষের মুখে তিনিও চান হাসি ফোটাতে এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে। সেই লক্ষ্যেই নিরলস পরিশ্রম করার দৃঢ়তায় আবিষ্ট হয়ে আছেন। রাজনীতি যাঁর মজ্জাগত। তাঁকে তো রাজনৈতিক কৌশল নিয়েই এগোতে হয়। বাধাবিঘ্ন উপড়ে ফেলে লক্ষ্যে পৌঁছানোই হচ্ছে রাজনীতির ব্রত। ছাত্র রাজনীতিতে যাঁর উত্থান, জাতীয় রাজনীতিতে তিনি তো তরী বেয়ে তীরে পৌঁছাতে চাইবেনই। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্ট পিতা-মাতা, ভাই, ভ্রাতৃবধূসহ আত্মীয়স্বজনের নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার পর এক ধরনের অমানিশা নেমে এসেছিল প্রবাসে থাকা দুই বোনের জীবনে। মাথার ওপর আকাশ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। টালমাটাল পরিস্থিতি। বদলে গেছে পৃথিবী যেন। বদলে গেছে দেশ। ঘাতকেরা মসনদ ফেরার পথ রুদ্ধ করে রেখেছে। পিতা-মাতা স্বজনদের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনায় কবর জিয়ারত করার জন্য দেশে ফেরায়ও বাধা। এমনকি ঘটনার সময় যে বাংলাদেশি রাষ্ট্রদূতের বাসভবনে ছিলেন, সেখানেও ঠাঁই হলো না। প্রথম বিরূপ বিশ্বের মুখোমুখি হলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা। প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু হলো তখন থেকেই। সহায়তার হাতও ক্রমশ এগিয়ে এলো। তারপর লন্ডন। সেখান থেকে দিল্লি। ভারতে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছিলেন। নিরাপত্তাও ছিল কঠোর। বঙ্গবন্ধুর ঘাতকরা এই দুই কন্যাকেও পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার নানা কূটকৌশল নিয়েছিল। শেখ হাসিনা দিল্লিতে অবস্থানকালে সেখানে ঢাকা থেকে যাওয়া সরকারি ট্রাস্টের পত্রিকার সাংবাদিককে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। সাপ্তাহিক পত্রিকাটি বিরূপভাবে তা পরিবেশন করে। পরপর কয়েক সংখ্যায় শেখ হাসিনার ইমেজ ক্ষুণ্ণ করার জন্য বারবার প্রতিবেদনও ছেপেছিল। শেখ হাসিনা বারবার দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুতি নিলেও ক্ষমতা দখলকারী সাময়িক জান্তা শাসক জিয়া বাধা প্রদান করতে থাকে। পিতা-মাতার কবর জিয়ারত করার সুযোগটুকু দিতে অপারগতা প্রকাশ করে। শেখ হাসিনা যাতে দেশের ফিরতে না পারেন, সেজন্য নানা অপপ্রচারও চালানো হয়। কিন্তু জনগণ ততদিনে ‘শেখের বেটি’ দেশে আসুক, এটিই চাইছিল।

আমাদের স্মরণে আসে, বিয়াল্লিশ বছর আগের এক ঐতিহাসিক দিন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে’র দৃশ্যপট। দখলদার সামরিক জান্তা শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে ফিরে এলেন বাংলার ইতিহাসের ট্রাজিক কন্যা শেখ হাসিনা নিজ মাতৃভূমিতে। যেখানে জন্মেছেন তিনি ভারতবর্ষ ভাগ হওয়ার দেড় মাসের মাথায়। আর জন্মেই দেখেছেন ‘ক্ষুব্ধ স্বদেশ ভূমি’। সেদিন লাখ-লাখ মানুষ বৃষ্টিতে ভিজে তাদের প্রাণপ্রিয় নেত্রীকে বরণ করে নিতে বিমানবন্দরের সামনে ছিল উন্মুখ। পুরো শহর পরিণত হয়েছিল জনসমুদ্রে। তিনি এলেন সেই ভূমিতে, যেখানে নির্মম-নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। হত্যাকারী ও তাদের বশংবদরা দখলে রেখেছে রাষ্ট্রক্ষমতা। তিনি ফিরে এলেন দীর্ঘ নির্বাসন শেষে, যেমন এসেছিলেন পিতা। কিন্তু পিতা এসেছিলেন নয় মাসের কারাজীবন শেষে স্বাধীন স্বদেশ ভূমিতে। স্বাধীনতার সব অর্জন তখন ভূলুণ্ঠিত। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, এই পাকিস্তানি ও সাম্প্রদায়িক ভাবধারা থেকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই। যারা একাত্তরে গণহত্যা চালিয়েছে, সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প ছড়িয়েছে, তারা আবার রাজনীতিতে পুনর্বাসিত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির দুয়ার খুলে দেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারের পথ রুদ্ধ করা হয়েছে, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ ধ্বংস করা হচ্ছে। জংলি শাসনের জাঁতাকলে দেশের মানুষ। এমনকি তাদের ভাত ও ভোটের অধিকার নেই। আর এই সবকিছুকে মোকাবিলা করেই এগিয়ে যেতে হবে অতল অন্ধকার দূর করে। স্বদেশ মাটিতে পা রেখে, নেতাকর্মী ও জনতার আবেগে সিক্ত হয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেছিলেন স্বজনহারা শেখ হাসিনা, ‘আমার কিছু নেই। বাবা-মা-ভাই আত্মীয়স্বজন সবাইকে হারিয়ে আজ আমি নিঃস্ব। আমি আপনাদের কাছে শপথ করছি, আমার দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়াই করে যাব।’ জানা ছিল তাঁর, লড়াইয়ের পথটি শ্বাপদসংকুল পথ, বাধাবিপত্তি, নিষেধাজ্ঞা, শাসন-ত্রাসন, জেল-জুলুম শুধু নয় – জীবনও হতে পারে বিপন্ন। তবু এই শপথের আলোয় আলোকিত হয়ে তিনি বিয়াল্লিশ বছর ধরে এসব মোকাবিলা করে, এখনো সক্রিয় মানবমুক্তির লড়াই-সংগ্রামে। মানুষের জন্য, মানবতার জন্য নিরলস প্রয়াস তাঁকে জননেত্রীতে পরিণত করেছে। কিন্তু এই উত্তরণের পথে পথে ছিল কাঁটা বিছানো। কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না কিছুই। সব জঞ্জাল সাফ করতে করতে বিরূপ বিশ্বে চলেছেন জনগণকে সঙ্গে নিয়ে পথে-প্রান্তরে।

প্রবাসে থাকাবস্থায় ১৯৮১ সালে পিতার প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনকারী দল আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হওয়ার পর ‘নিউজ উইক’ পত্রিকায় দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন শেখ হাসিনা, ‘সরকারের শক্তিকে পরোয়া করি না, মৃত্যুকেও না। জীবন তো একটাই, একজীবনেই ঝুঁকি নিতে হবে। মৃত্যুকে ভয় করলে জীবনের কোনো মর্যাদা থাকে না। সমগ্র জাতির পূর্ণ গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারই হবে আমার অন্যতম অগ্রাধিকার। আমার বাবার প্রতি দেশের জনগণের প্রচণ্ড ভালোবাসা ও মমতা রয়েছে, জাতির জন্য তাঁর যে স্বপ্ন তা আমি পূরণ করব।’ শেখ হাসিনার জানা ছিল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অবিকৃত নেই। শেখ হাসিনা দেশে ফিরে পিতৃগৃহ ৩২ নম্বরের বাসভবনে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। বাড়ির সামনে সড়কে বসে দোয়া ও মিলাদ পাঠ করতে হয়েছিল। এতই নিষ্ঠুর ছিল জান্তা শাসক যে, অসহায় এতিম দুই বোনকে বাবা-মা-স্বজনদের সমাধিস্থলে যেতে দেয়নি। জিয়ারত করতে দেওয়া দূরে থাক। তথাপি শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর অধিকাংশ সংবাদপত্র ছিল উচ্ছ্বসিত। শিরোনাম হয়, ‘লাখো জনতা অকৃপণ হাতে প্রাণঢালা অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে বরণ করে নেয় তাদের নেত্রীকে’ (সংবাদ ১৮ মে ১৯৮১)। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের সভানেত্রী হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর থেকেই তিনি আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠেন। তিনি যখন সক্রিয় রাজনীতিতে অবতীর্ণ হন, তাঁর পূর্বাপর সময়ে বিশ শতকের দুই দশকে গণমাধ্যমের সহায়তা মেলেনি। পঁচাত্তরের পনেরোই আগস্টের পর দেশে সামরিক শাসন জারি হয়। নব্বই সাল পর্যন্ত টানা পনেরো বছর সামরিক জান্তা শাসকরা ক্ষমতা দখল করে দেশ থেকে গণতন্ত্রসহ স্বাধীতার মূল্যবোধকে ধ্বংস করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখে। গণমাধ্যমগুলোকে নিয়ন্ত্রণে নেয়। সেন্সরশিপ চালু রাখে। তাদের মূল লক্ষ্যই ছিল ইতিহাস বদলে দেওয়া এবং বঙ্গবন্ধুর নামগন্ধ সবকিছু থেকে মুছে ফেলা। সেই অবস্থান থেকে সামরিক শাসকদেরও ‘টার্গেট’ হন শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনাই প্রথম ১৯৮২ সালে সামরিক ক্যু’দেঁতাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সোচ্চার হন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সংগ্রাম শুরু করেন।

জিয়া হত্যার পর দেশের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য শেখ হাসিনা সচেষ্ট ছিলেন। এই হত্যার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে বলেছেন যে, এরূপ হত্যা চলতে থাকবে, যদি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার না হয়। ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, পাকিস্তানি ভাবধারায় পরিচালিত সামরিক জান্তা শাসকদের হুমকিধমকিতেও শেখ হাসিনা সাহস হারাননি। বরং পিতার মতোই সাহস সঞ্চয় করেছেন।

শেখ হাসিনা যখন সভানেত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন তাঁর বয়স চৌত্রিশেরও কম। দলের অনেক বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাই ধরে নিয়েছিলেন নেত্রীকে সামনে রেখে তারা দল চালাবেন। এমনকি নেত্রীর বয়স কম, রাজনীতিতে অপরিপক্ব ইত্যাকার প্রচারণা দলের অভ্যন্তরে চালানো হতো। কিন্তু যখন তারা দেখল যে, শেখ হাসিনাকে বশীভূত করা যায় না, পিতার মতোই সাহসী, অদম্য এবং রাজনৈতিক কৌশলে অনেক অগ্রগামী। এরাই পরে দল থেকে বেরিয়ে পৃথক রাজনৈতিক দলও গঠন করেছিল আওয়ামী লীগকে দুর্বল করার জন্য জান্তা শাসকদের অনুপ্রেরণায়। স্মরণ করতে পারি, ১৯৮১ সালের জুলাইয়ে ডাকসুতে নির্বাচিত ছাত্রলীগের ১৩ জনকে ৩২ নম্বরের বাসভবনে ডেকেছিলেন। ১৯৮০ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ডাকসুর ১৯টি আসনের মধ্যে ছাত্রলীগ সম্পাদক ও সদস্যসহ ১৩টি পদে বিজয়ী হয়েছিল। এই নিবন্ধের লেখক সাহিত্য সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। এর আগের বছর ১৯৭৯ সালের নির্বাচনে সদস্যপদে নির্বাচিত হই। দেশবাসী কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের নির্বাচনে ছাত্রলীগের তখন জয়জয়কার। ডাকসুর নেতাদের উদ্দেশ্যে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার ব্রত আমাদের। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর দেশকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে। জনগণের সব অধিকার কেড়ে নিয়েছে সামরিক জান্তা শাসকরা। ছাত্রসমাজকে অধিকার আদায়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে হবে।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘আমি বাবা-মা, ভাইসহ সব হারিয়েছি। আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। বাংলায় মানুষের সেবা করার জন্য আমার জীবন উৎসর্গ করছি।’

স্বদেশে ফিরে শেখ হাসিনা দেখেছেন এক সামরিক জান্তা থেকে আরেক সামরিক জান্তার দুঃশাসন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে তাই অবিচল দৃঢ়তা নিয়ে তিনি সামনে চলার পথ তৈরি করে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। শেখ হাসিনার পক্ষে সারা দেশে জোয়ার উঠতে থাকে। জনগণের কাছে তিনি ‘শেখের বেটি’ থেকে মুক্তিদাতার আসনে সমাসীন হয়ে উঠেন।
আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে শেখ হাসিনা তাঁর নেতৃত্ব বিকাশের চরম পরীক্ষা দিয়েছেন। গণতন্ত্রের মানসকন্যা হিসেবে তিনি প্রতিভাত হতে থাকেন। আলোচনা-সমালোচনা সত্ত্বেও শেখ হাসিনা স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড প্রতিরোধ সৃষ্টি করেছিলেন। ১৯৮৬ সালের মধ্যেই তিনি জনগণের আশা-আকাক্সক্ষার প্রতিভূ হয়ে ওঠেন।

শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে গুরত্বপূর্ণ সময় ছিল ১৯৮৬ সাল। সংসদের ভেতর ও বাইরে তিনি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যান। জনগণ তাঁর ভূমিকাকে প্রশংসিত করলেও বিএনপিসহ অন্যরা সমালোচনা ও নিন্দা অব্যাহত রাখেন। সংসদে বিরোধী দলের নেত্রী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। একই সঙ্গে সংসদীয় গণতন্ত্র সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে শেখ হাসিনা ১৯৮৬ সালে শুভযাত্রা শুরু করেন। এই সময়ের সফলতা এবং বৃহত্তর আন্দোলনের অঙ্গীকার তাঁকে জননেত্রীতে উন্নীত করে। দেশে ফেরায় ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর ছয় বছরের মাথায় তিনি নিজেকে জনগণের নেত্রী এবং দেশ ও জাতির মুক্তির মানসকন্যা হিসেবে নিজের অবস্থান দৃঢ় করেন, যা পরবর্তীকালের তৎপরতায় গণতন্ত্রের মানসকন্যা হিসেবে জনমনে ঠাঁই পান। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৬ সাল – এই সময়কাল ছিল শেখ হাসিনার জন্য বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী হিসেবে নিজেকে জনসমাদৃত করার পর্ব। এই পর্বে তিনি সামরিক জান্তা শাসনের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখেন। করা ও গৃহবন্দিকাল তাঁকে পর্যুদস্ত করতে পারেনি। জেল, জুলুম, নির্যাতন, শাসকের রক্তচক্ষুÑসবকিছুকে উপেক্ষা করে তিনি বিভক্ত দলকে সংগঠিত করার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে সক্ষম হয়েছিলেন। ছয় বছরে তিনি নিজেকে বাংলাদেশের রাজনীতে বঙ্গবন্ধুর পর অপরিহার্য হিসেবে নিজস্ব অবস্থানকে সংহত করেছেন। এভাবেই চার দশকের বেশি সময় বাংলাদেশের রাজনীতির গতিপ্রকৃতির নিয়ামকে পরিণত হয়েছেন। এগিয়ে চলার পথকে তিনি ক্রমশ কণ্টকময় করতে পেরেছেন। জাতিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দেশকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করার অভিপ্রায় নিরলস পরিশ্রম করে চলেছেন। একাশি থেকে ছিয়াশি সময়কাল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, নানামুখী ষড়যন্ত্র, চক্রান্ত, বিরোধিতাকে তিনি ক্রমশ রাজনৈতিক কৌশলের আলোকে পর্যুদস্ত করে এগিয়েছেন। শত বাধাবিপত্তিকে গুঁড়িয়ে ফেলতে হয়েছেন সক্ষম। বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, রবীন্দ্রনাথের বাণী আর বাংলার জনগণেল আশা-আকাক্সক্ষাকে ধারণ করে তিনি বাঙালি জনমানসে ভগিনী। জননীরূপে সমাসীন হয়ে আছেন। বাংলার প্রতি ঘরে তিনি আজ আলো হয়ে জ্যুতি ছড়াচ্ছেন। আর এই থামার নয়, ক্রমাগত এগিয়ে চলার।

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক; কবি ও মহাপরিচালক, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field
    X