গদ্য বিশেষ সংখ্যা

মতিন রায়হান | জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা | প্রবন্ধ

বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে এ পর্যন্ত কী পরিমাণ কবিতা ও ছড়া রচিত হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর মেলা কঠিন। ধারণা করি, দেশে-বিদেশে রাজনীতির এই কবিকে নিয়ে কয়েক হাজার কবিতা ও ছড়া রচিত হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এ-কথা জোর দিয়েই বলতে পারি, পুরো বিশ্বে এমন কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নেই যাঁকে নিয়ে রচিত হয়েছে এতসব বিচিত্র কবিতা ও ছড়া। কেন এত কবিতা ও ছড়া রচিত হয়েছে তাঁকে নিয়ে? এ প্রশ্নের জবাবও খুব সহজ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন এক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব – যাঁর প্রজ্ঞা, বাগ্মিতা, নেতৃত্বগুণ, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, রসবোধ ইত্যাদি তাঁকে সমগ্র বিশ্বে অপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছে। যাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বে জন্মলাভ করেছে একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র – বাংলাদেশ। আর এই জাতিরাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা ও নির্মাতাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যার ঘটনাও সংবেদনশীল কবি ও ছড়াকারদের ভীষণ মর্মাহত করেছে। এর ফলেও রচিত হয়েছে অসংখ্য মর্মস্পর্শী কবিতা ও ছড়া।
বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা ও ছড়াকে তিনটি মোটা দাগে ভাগ করা যায়। একটি তাঁর জীবদ্দশায় অর্থাৎ ১৯৭৫ পূর্বকালে রচিত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও দূরদর্শিতার পরিচয়বহ কবিতা ও ছড়া। আর দ্বিতীয়টি ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যা এবং অব্যবহিত পরে রচিত বেদনামথিত উচ্চারণগাথা। তৃতীয়টি হচ্ছে বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষে রচিত কবিতা ও ছড়া।
শুরুতেই আলোচনা করতে চাই, জন্মশতবর্ষে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা প্রসঙ্গে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে কী পরিমাণ কবিতা রচিত হয়েছে, এর পূর্ণ পরিসংখ্যান তুলে আনা বেশ সময়সাধ্য ব্যাপার। কারণ এসব কবিতার বেশিরভাগ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পত্রপত্রিকার বিশেষ সংখ্যা অর্থাৎ ১৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন, শোকাবহ ১৫ই আগস্ট, ২৬শে মার্চ স্বাধীনতা দিবস, ১৬ই ডিসেম্বর বিজয় দিবস ইত্যাদি সংখ্যায়। এসব কবিতার প্রায় অধিকাংশই কবিদের নিজস্ব কাব্যগ্রন্থ ও বঙ্গবন্ধু বিষয়ক কাব্যসংকলনে গ্রন্থিত হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষকে উপলক্ষ্য করে ব্যক্তিগত, সমষ্টিগত এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বেশ কিছু নিবেদিত কাব্যসংকলন প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রতিনিধিত্বশীল সংকলনগুলোর ওপর এই আলোচনা সীমাবদ্ধ রাখতে চাই। উল্লেখযোগ্য কাব্যসংকলনের মধ্যে প্রথমেই রয়েছে বাংলা একাডেমি প্রকাশিত কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা’ (২০২১) শীর্ষক সংকলনটি। এই কাব্যসংকলনে গ্রন্থিত হয়েছেন ১৩১ জন কবি। প্রত্যেক কবিরই একটি প্রতিনিধিত্বশীল কবিতা এখানে সংকলিত হয়েছে। ১৮০ পৃষ্ঠার এই সংকলনে কবি জসীমউদদীন থেকে শুরু করে কবি মুজিব ইরম পর্যন্ত সংকলিত হয়েছেন। সংকলিত কবিদের বয়সের শেষ সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। এই সংকলনের নির্বাহী সম্পাদক মোবারক হোসেন। সম্পাদনা-পর্ষদে ছিলেন প্রাবন্ধিক-সম্পাদক আবুল হাসনাত (কবি ‘মাহমুদ আল জামান’ নামে যিনি সমধিক পরিচিত। সংকলনটির সম্পাদনা কালে তাঁকে আমরা হারাই। এই মুহূর্তে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করি)। সম্পাদনা-পর্ষদে আরও দুজন স্বনামধন্য কবি ছিলেন একজন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ও অন্যজন কবি কামাল চৌধুরী। এই সংকলনে কবিতা বিন্যাস করা হয়েছে কবিদের বয়ঃক্রম অনুসারে।
এবার যে সংকলনটির কথা উল্লেখ করছি সেটি একটি বিশেষ কাব্যসংকলন। শিরোনাম ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিবেদিত কবিতা’ (২০২২)। কবি কামাল চৌধুরী সম্পাদিত এই সংকলনের সম্পাদনা পরিষদে রয়েছেন কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, কবি মিনার মনসুর, কবি তারিক সুজাত ও রিয়াজ আহমেদ। ৪৭৮ পৃষ্ঠার বিশাল কলেবরের এই সংকলনে গ্রন্থিত হয়েছেন ৩৬৩ জন কবি। কবিতা সাজানো হয়েছে কবিদের নামের বর্ণক্রম অনুসারে। এই সংকলনটির প্রকাশক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। আর প্রকাশনা সহযোগী ছিল পাঠক সমাবেশ। সরকারি পৃষ্ঠপোষণায় প্রকাশিত এই সংকলনে বঙ্গবন্ধু বিষয়ক যত কবিতা পাওয়া গেছে তাই অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে সংকলিত কবিতার অধিকাংশই নতুন কবিতা। এই সংকলনে গ্রন্থিত কবিতার মান নিয়ে প্রশ্ন না তুলেও এ কথা বলা যায় যে, এটি একটি অসাধারণ ডকুমেন্টেশন। বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতা নিয়ে কোনো গবেষক যদি কাজ করতে উদ্বুদ্ধ হন তাহলে তিনি এই সংকলন থেকে দরকারি সব রসদ পেয়ে যাবেন। এই সংকলনের সম্পাদক, সম্পাদনা পরিষদ-সহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আমি অভিনন্দন জানাই।
এবার যে সংকলনটির প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে চাই সেটির সম্পাদকও কবি কামাল চৌধুরী। দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড কর্তৃক প্রকাশিত ‘মহাকালের তর্জনী’ (২০২২) শীর্ষক এই সুনির্বাচিত সংকলনটির কলেবর ২৫০ পৃষ্ঠা। বলতে পারি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি কর্তৃক প্রকাশিত ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে নিবেদিত কবিতা’ শীর্ষক সংকলন সম্পাদনার সূত্র ধরেই এই সংকলনটির জন্ম। সংকলন সম্পাদক কবি কামাল চৌধুরী পূর্বোক্ত সংকলনটি সম্পাদনা করতে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন, তা-ই কাজে লাগিয়েছেন ‘মহাকালের তর্জনী’ সম্পাদনা কালে। এই সংকলনে সম্পাদক বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বঙ্গবন্ধু বিষয়ক ঐতিহাসিক কবিতাগুলো সংকলনের পাশাপাশি নতুন কবিতাও গ্রন্থিত করেছেন। শুধু কবিদের কবিতা সংকলন করেই তিনি থেমে থাকেননি, গ্রন্থিত করেছেন কথাসাহিত্যিকদের রচিত নিবেদিত কবিতাও। এই সংকলনের সূচনা হয়েছে বনফুল (জ. ১৮৯৯)-এর নিবেদিত কবিতা দিয়ে আর শেষ হয়েছে মোস্তাক আহমাদ দীন (জ. ১৯৭৪)-এর নিবেদিত কবিতা সংকলনের মধ্য দিয়ে। গ্রন্থিত কবির সংখ্যা ১৫০। সম্পাদকের দীর্ঘ দিনের শ্রম ও গবেষণার ফসল এই ‘মহাকালের তর্জনী’। সম্পাদকের দীর্ঘ ১২ পৃষ্ঠার ভূমিকাটি খুবই তাৎপর্যবহ। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে তাঁর জীবদ্দশায় লেখা কবিতা ও পঁচাত্তর পরবতী সময়ে রচিত প্রতিবাদী কবিতার একটি অনুপুঙ্খ ও গভীর বিশ্লেষণ এই ভূমিকায় উঠে এসেছে। কবিদের হৃদয়-উৎসারিত পঙ্ক্তিমালায় নানা মাত্রিকতায় বঙ্গবন্ধু যেমন উদ্ভাসিত, তেমনি বাঙালির শেকড়ের স্পন্দনও খুঁজে পাওয়া যায়। বঙ্গবন্ধু বিষয়ক কবিতা নিয়ে কোনো গবেষক কাজ করতে গেলে এই ভূমিকা থেকে এমনসব তথ্য পেয়ে যাবেন যা তাঁর গবেষণা ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়সূত্র হতে পারে। ‘মহাকালের তর্জনী’ নিঃসন্দেহে মুজিব শতবর্ষের একটি অনন্য প্রকাশনা। আবহমান বাংলা কবিতার ইতিহাসেও সংকলনটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হবে।
এবারের আলোচ্য সংকলনটির শিরোনাম ‘শত কবিতায় বঙ্গবন্ধু’ (২০২০)। এর প্রধান সম্পাদক বিশিষ্ট নাট্যজন লিয়াকত আলী লাকী এবং সম্পাদক কবি রুবী রহমান। প্রকাশক বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি। এই সংকলনে ১০০ জন কবির ১০০টি কবিতা গ্রন্থিত হয়েছে। একে পরিকল্পিত কাব্যসংকলন হিসেবে বিবেচনার সুযোগ নেই। কারণ কবি-তালিকায় চোখ বুলালেই সেটা অনেকটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এছাড়া সংকলিত কবিতা কবিদের বয়ঃক্রম কিংবা নামের বর্ণক্রম অনুযায়ী বিন্যাস করা হয়নি। ফলে হাতের কাছে যা পেলাম তা-ই নিয়ে নিলাম, এরকম কেউ ভাবলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। একটি নির্বাচিত কাব্য সংকলনের যেরকম বৈশিষ্ট্য থাকা দরকার তার ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে আলোচ্য সংকলনে। এয়াড়া বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে ব্যক্তি উদ্যোগেও দুয়েকটি নিবেদিত কাব্য সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে কবি সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধু ১০০ কবির ১০০ কবিতা’ (প্রকাশক স্বরব্যঞ্জন, ঢাকা, ২০১৯) ও কবি-ছড়াকার আসলাম সানী সম্পাদিত ‘বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ১০০ কবির ১০০ কবিতা’ (প্রকাশক অন্বেষা প্রকাশন, ঢাকা, ২০২২) প্রভৃতি।
আলোচ্য সংকলনগুলো কিংবা এর বাইরেও বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কী ধরনের কবিতা গ্রন্থিত হয়েছে এবার সেদিকে একটু দৃষ্টি ফেরাতে চাই। সত্তরের দশকের শুরুতে অর্থাৎ পঁচাত্তর পূর্বকালে তাঁকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন আমাদের দেশের শীর্ষস্থানীয় কবিরা। এ তালিকায় আছেন কবি জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামাল, সিকান্দার আবু জাফর, আবুল হোসেন প্রমুখ। বাদ যাননি পশ্চিমবঙ্গের কবি-সাহিত্যিকরাও। দক্ষিণারঞ্জন বসু, অন্নদাশঙ্কর রায়, সৌমেন্দ্রনাথ ঠাকুর, জগদীশচন্দ্র চক্রবর্তী, সত্যেশ্বর মুখোপাধ্যায়, শান্তিকুমার ঘোষ, বিনোদ বেরা, বনফুলসহ আরও অনেকে জনপ্রিয় রাজনীতিক শেখ মুজিবকে নিয়ে রচনা করেছেন নিবেদিত কবিতামাল্য।
আমাদের প্রবীণ কবি জসীমউদদীন লিখলেন ৭০ লাইনের ‘বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক এক অসাধারণ কবিতা’। কবি যখন বলেন : ‘মুজিবুর রহমান/ওই নাম যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উগারী বান।’১ তখন বঙ্গবন্ধুর স্বভাব-প্রকৃতি আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বঙ্গবন্ধুকে ঠিকই শনাক্ত করতে পেরেছিলেন আমাদের মাটি ও মানুষের কবি জসীমউদদীন। কবি সুফিয়া কামাল তাঁর ‘মুজিবের জন্মদিনে’২ শীর্ষক কবিতায় যখন বলেন : ‘তব জন্মক্ষণ/একক তোমার নহে। নিপীড়িত লক্ষ জনগণ/নবজন্ম লভি চেতনার/তোমারে লভিয়া কাছে হয়েছে দুর্বার।’ তখন বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন সমগ্র বাঙালির অভিন্ন চেতনার বাতিঘর এবং তাই তাঁর জন্মদিনে ‘নবজন্ম’ লাভ করে লক্ষ লক্ষ নিপীড়িত-নির্যাতিত-শোষিত-বঞ্চিত জনগণ। ১০ই জানুয়ারি ১৯৭২। বঙ্গবন্ধু ফিরে এলেন তাঁর সদ্য স্বাধীন প্রিয় স্বদেশে। বিজয়ীর বেশে তাঁর এই স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আবেগঘন ছবি আঁকলেন আমাদের আরেক বরেণ্য কবি সিকানদার আবু জাফর। ‘সাড়ে সাত কোটি বাঙালির কান্নায় পাথরে গড়া/সুমসৃণ পথে ফিরে আসছেন তিনি/ফিরে আসছেন বঙ্গ-ভারতের/সম্মিলিত রক্তস্নাত মহাপুণ্য পথে/বাংলাদেশের মরণ বিজয়ী মুক্তি সেনানী/ছাত্র জনতার/করতালি মুখরিত পথে/ফিরে আসছেন তিনি জাতির জনক/সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশে/নির্ভয় ভবিষ্যতের স্বপ্নদীপ্ত/নিরঙ্কুশ প্রত্যাশার পথে।’৩
কারামুক্ত বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন স্বদেশে ফিরে এসে শুরু করলেন দেশ পুনর্গঠনের কাজ। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের ধ্বংস্তূপের মধ্যে জেগে উঠলো যেন অগণন লড়াকু প্রাণ। কিন্তু সেই জাগরণ সহ্য করতে পারলো না পরাজিত শত্রুরা। শুরু হলো গভীর ষড়যন্ত্র। কীভাবে বঙ্গবন্ধুকে সরিয়ে দেয়া যায় রাজনীতির মঞ্চ থেকে। সেই লক্ষ্যে ওরা নীলনকশা রচনা করে। অতঃপর দুষ্ট চক্রের মদদে কতিপয় বিপথগামী উচ্ছৃঙ্খল সেনাসদস্য ১৯৭৫-এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করে। তারপরই বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসে বিশ্বাসঘাতকেরা। ক্রমে ক্রমে স্বৈরশাসনের জগদ্দল পাথরে চাপা পড়ে জাতির ভবিষ্যৎ। অনেক রক্তক্ষয় আর রাজনৈতিক চড়াই-উৎরাইয়ের পর এক পর্যায়ে গণতন্ত্র মাথা তুলে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ যেন ফিরে পায় তার সঠিক গন্তব্য। বঙ্গবন্ধু প্রত্যাবর্তন করেন স্বমহিমায়। তাঁকে নিয়ে রচিত হতে থাকে অজস্র কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, নাটক আর গান। প্রতিদিনের জীবনভাবনায় তিনি আছেন; তাঁকে উপলক্ষ্য করে চলছে অগ্রগতির অনিবার অভিযাত্রা।
বঙ্গবন্ধুকে নির্মমভাবে হত্যার পর তাঁকে নিয়ে কবিতা লেখা খুব সহজ ছিল না। কারণ স্বৈরাচারী সেনাশাসকের রক্তচক্ষু শাসিয়ে বেড়াচ্ছিল পুরো দেশ। ১৯৭৭ সালে বিপুল প্রতিকূল পরিবেশে অসম সাহসে কবি নির্মলেন্দু গুণ উচ্চারণ করলেন : ‘আমি আজ কারো রক্ত চাইতে আসিনি’ শীর্ষক কবিতাটি। একুশের ভোরে বাংলা একাডেমির কবিতা পাঠের আসরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর প্রকাশ্যে পঠিত প্রথম কবিতা এটিই। কবি বলছেন : ‘শহীদ মিনার থেকে খসে-পড়া একটি রক্তাক্ত ইট/গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি।/আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।’ কিংবা, ‘এই বসন্তের বটমূলে সমবেত ব্যথিত মানুষগুলো সাক্ষী থাকুক,/না-ফোটা কৃষ্ণচূড়ার শুষ্কভগ্ন অপ্রস্তুত প্রাণের ঐ/গোপন মঞ্জরীগুলো কান পেতে শুনুক,/আসন্ন সন্ধ্যার এই কালো কোকিলটি জেনে যাকÑ/আমার পায়ের তলায় পুণ্য মাটি ছুঁয়ে/আমি আজ সেই গোলাপের কথা রাখলাম,/আজ সেই পলাশের কথা রাখলাম,/আজ সেই স্বপ্নের কথা রাখলাম।’৪
পঁচাত্তর সালে সাংবাদিক-সাহিত্যিক সন্তোষ গুপ্ত রচনা করেন ‘রক্তাক্ত প্রচ্ছদের কাহিনী’ শিরোনামে একটি কবিতা। কবিতাটিতে বঙ্গবন্ধু হত্যার হৃদয়সংবেদী বেদনাগাথা উঠে এসেছে। কবির ভাষায় : ‘একটি নামের মধ্যে উঠে আসে বাংলাদেশ/স্বপ্নের পাখির সুর, নিসর্গের কোমলগান্ধার/মৃদুকণ্ঠ ভালোবাসা সাজানো বাগান/…একরাতে সবই নিহত হলো সপরিবারে/নিসর্গ পাখি ফুল ভালোবাসা নদীর নারীর গান।’
প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করতে চাই, বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর কতিপয় প্রতিবাদী তরুণ প্রকাশ করেন ‘এ লাশ আমরা রাখবো কোথায়?’ শীর্ষক একটি কবিতা সংকলন। এটি প্রকাশিত হয় ১৯৭৮ সালে এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এটিই প্রথম সংকলন। এই দুঃসাহসিক সংকলনের পরিকল্পক ছিলেন ছড়াকার আলতাফ আলী হাসু। সংকলনে সম্পাদক হিসেবে কারও নাম ছিল না। তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অজ্ঞাত সংগঠন ‘সূর্য তরুণ গোষ্ঠী’র নামে এটি প্রকাশিত হয়। আরও একটি সাহিত্য সংকলন-গ্রন্থ প্রকাশিত হয় চট্টগ্রাম থেকে। শিরোনাম ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ (১৯৭৯)। এর সম্পাদক ছিলেন কবি মিনার মনসুর ও দিলওয়ার চৌধুরী। এটিও ছিল এক দুঃসাহসী সম্পাদনা। পরে অবশ্য আরও দু’চারটি কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, বাংলা একাডেমি প্রকাশিত বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষ গ্রন্থমালায় ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ শীর্ষক সংকলনটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়েছে।
আমাদের স্বাধীনতার কবি শামসুর রাহমান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচনা করেন কালজয়ী কবিতা ‘ধন্য সেই পুরুষ’। কবি দীপ্র কণ্ঠে উচ্চারণ করেন : ‘ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের উপর পাখা মেলে দেয় জ্যোৎস্নার সারস,/ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের উপর পতাকার মতো দুলতে থাকে স্বাধীনতা,/ধন্য সেই পুরুষ যাঁর নামের ওপর ঝরে মু্ক্তিযোদ্ধাদের জয়ধ্বনি।’
বঙ্গবন্ধুর মর্মন্তুদ মৃত্যুর পর কবি-সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী রচনা করেন ‘বঙ্গবন্ধু’ শীর্ষক কবিতাটি। এ কবিতায় একদিকে যেমন রয়েছে বেদনাঘন উচ্চারণ, অন্যদিকে ঝরে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ। তাঁর ভাষায় : ‘আজ বাংলার ভাগ্যবিধাতা মাটির কবরে শায়িত/দশকোটি বাঙালি আজ রাজাকার দ্বারা শাসিত/কুকুর এখন মসনদে বসে/সিংহচর্ম গায়ে দেয় কষে/বিদেশি প্রভুর সেবায় এখন পদানত দাস নিরত/তুমি তো হয়েছ শহীদ বন্ধু বাঙালি হয়েছে নিহত।’
‘আমার পরিচয়’ কবিতায় সৈয়দ শামসুল হক যেন বাঙালির আত্মপরিচয়ের সুলুকসন্ধান করেছেন। কবির ভাষায় : ‘এই ইতিহাস ভুলে যাবো আজ, আমি কি তেমন সন্তান?/ যখন আমার জনকের নাম শেখ মুজিবুর রহমান;/তাঁরই ইতিহাস প্রেরণায় আমি বাংলার পথ চলিÑ/চোখে নীলাকাশ, বুকে বিশ্বাস, পায়ে উর্বর পলি।’
কবি বেলাল চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির বত্রিশ নম্বর সড়কের বাড়িটির পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে যেন বাঙালির সংগ্রামের ইতিহাসকেই গ্রন্থনা করেছেন অসাধারণ শব্দবন্ধে। ‘বত্রিশ নম্বর’ শিরোনামের কবিতার শেষ পঙ্ক্তিগুলো আমাদের আবেগাপ্লুত ও অশ্রুসজল করে তোলে। কবির ভাষায় : ‘পাশে হতভম্ব প্রিয় ব্রায়ার পাইপ/উল্টে আছে পায়ের চটি যুগল/পরনের লুঙ্গি গেঞ্জি সবই রক্তস্নাত/ঘরোয়া ভঙ্গিতে আলগুছে শুয়ে রয়েছেন যেন/দু’চোখে অগাধ বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের বিস্ময়!/একদিকে মানুষের ঢল অনর্গল/তাদের চোখের টলমলে অশ্রুতে বিম্বিত/বত্রিশ নম্বরই স্বাধীনতার পবিত্র সনদ আর অঙ্গীকারনামা।’
শহীদ কাদরীর ‘হন্তারকদের প্রতি’ শীর্ষক কবিতায় হন্তারকদের নিখুঁত ছবি অঙ্কন করা হয়েছে সূক্ষ্ম শ্লেষের মধ্য দিয়ে। কবির ভাষায় : ‘তাদের পরনে ছিল ইউনিফর্ম/বুট, সৈনিকের টুপি/বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তাদের কথাও হয়েছিল/তারা ব্যবহার করেছিল/এক্কেবারে খাঁটি বাঙালির মতো/বাংলা ভাষা। অস্বীকার করার উপায় নেই ওরা/মানুষের/মতো দেখতে, এবং ওরা মানুষই/ওরা বাংলার মানুষ/এর চেয়ে ভয়াবহ কোনো কথা আমি আর শুনবো না কোনোদিন।’
‘এই সিঁড়ি’ শীর্ষক কবিতায় মুক্তিযোদ্ধা কবি রফিক আজাদ রচনা করেছেন এক করুণ বেদনাগাথা। তাঁর উচ্চারণটি ঠিক এরকম : ‘এই সিঁড়ি নেমে গেছে বঙ্গোপসাগরে,/সিঁড়ি ভেঙে রক্ত নেমে গেছেÑ/বত্রিশ নম্বর থেকে/সবুজ শস্যের মাঠ বেয়ে/অমল রক্তের ধারা বয়ে গেছে বঙ্গোপসাগরে।’
কবি আসাদ চৌধুরীর ‘এ কেমন জন্মদিন’ শীর্ষক কবিতায় যখন বলেন : ‘এ কেমন জন্মদিন, খাঁ-খাঁ বুক, বেলুন-ফুটকা নাই,/লাল-নীল বাত্তি নাই,/কোনোখানে উৎসবের চিহ্নমাত্র নাই।/হে পিতা, তোমার জন্মদিনে/তোমার ও বাঙালির এ কেমন ভিন্ন আচরণ?…/এ কেমন জন্মদিন মৃত্যুদৃশ্য ভেসে ওঠে শুধু/পদ্মা-মেঘনা-যমুনার পলি দিয়ে গড়া/সাগরের লোনা মুখ থেকে কেড়ে নেওয়া মাটি,/ভাটার পানিটা সরে গেলে/বাঘের থাবার চিহ্ন,/হরিণের ধাবমান খুর-রেখা,/পিতামহদের দীঘল নিঃশ^াস, শত শতাব্দীর অপমান/তুমি তো সেখানে পিতা, পেতেছো বিশাল সিংহাসনÑ/যে ঘাতক তোমার সুবিশাল ছায়াতলে/থেকে কেড়ে নিলো তোমার নিশ্বাসের/ শিশুঘাতী, নারীঘাতী ঘাতকেরে যে করিবে ক্ষমা/তার ক্ষমা নাই/ আমরা অনুগত,/ তোমারই অবাধ্য হবো আজ,/ পিতা, অনুমতি দাও।’ তখন করুণ বেদনা থেকে উত্থিত আমাদের ঘৃণা ও ক্ষোভ যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গ হয়ে ঝরে পড়ে। নৃশংস ঘাতক হত্যাকারীদের প্রতিশোধ নিতে পিতার কাছে অনুগত থেকেও আমরা সমস্বরে গর্জে উঠি, প্রতিরোধস্পৃহায় গজরাতে থাকি।
কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা তাঁর নিবেদিত কবিতায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘যিসাস’ হয়ে উঠেছেন। ‘যিসাস মুজিব’ কবিতায় তিনি বলেন : ‘ফুরাবে না গঙ্গাধারা, ফুরাবে না বঙ্গবাসী কলমের নিব/ফুরায় না এই রক্ত, পিতা, তুমি যিসাস মুজিব।’
এই কবিই আবার ‘অনন্ত মুজিব জন্ম’ শীর্ষক কবিতায় শতবর্ষের বন্ধন মুক্ত করে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সমকাল-অতিক্রমী অর্থাৎ ‘মহাকালের নায়ক’ করে তুলেছেন। কবির ভাষায় : ‘কে বলে তোমার জন্ম এই বঙ্গে শুধু শতবর্ষ আগে?/ কে বলে তোমার জন্ম থেমে গেছে ঘাতক-মৃত্যুতে?/ তুমি আছো স্বর্গে-মর্ত্যে উদয়াস্ত অভ্র অনুরাগে,/পলে পলে পল্লবিত, সর্বভূতে, সব ফলন্ত ঋতুতে।’
সত্তর দশকের প্রতিনিধিত্বশীল কবি নাসির আহমেদ ‘তোমাকে চিনিনি বহুদিন’ শীর্ষক কবিতায় বঙ্গবন্ধুকে মুখোমুখি তিনবার দেখার কথা উল্লেখ করে কবিতাটির শেষে এসে বলেন : ‘পিতৃহারা হয়ে জানি আমি কোন্ বীরের সন্তান!/ কত আক্রমণ ছিল তোমার বিরুদ্ধে আজ বুঝি/ তুমি প্রতিশোধহীন, সবুজ বিপ্লবে মগ্ন ছিলে,/ সমৃদ্ধির স্বপ্নে তুমি ভুলে গেলে শত্রু-পূর্বাপর!/ যেন তুমি ধর্মগ্রন্থ, নীরব অক্ষর আজ কল্যাণের বাণী/ ক্ষমা করো এই গ্লানি – তোমাকে চিনিনি পিতা বহুদিন আমি।’ কবির এই আত্মগ্লানি যেন সমগ্র মানবিক বাঙালির গ্লানিতে পরিণত হয়। এমন একজন জনলগ্ন, স্বদেশপ্রেমী মানুষকে চিনতে না পারাটা জাতি-বাঙালির চরম ব্যর্থতাও বটে।
পঁচাত্তর-উত্তর প্রতিকূল সময়ে বঙ্গবন্ধুর স্মরণে সত্তরের নিবেদিতপ্রাণ কবি, সময়ের সাহসী সন্তান কামাল চৌধুরী লিখলেন ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’ শীর্ষক অনবদ্য কবিতা। সম্ভবত বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি সার্থক কবিতা লিখেছেন তিনি। গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত মিলিয়ে প্রায় পঁচিশটি কবিতা লিখেছেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে রচিত তাঁর একক কাব্যগ্রন্থ ‘টুঙ্গিপাড়া গ্রাম থেকে’। এই গ্রন্থের ষাট লাইনের নাম-কবিতাটি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লেখা কবির গভীর সংবেদনময় কবিতা। পুরো কবিতাটিই উদ্ধৃতিযোগ্য। কবি যখন বলেন : ‘হে আমার স্বাধীনতার মহান স্থপতি/ মহান প্রভুর নামে আমার শপথ/ সেই বৃদ্ধদের প্রতি আমার শপথ/ সেইসব ভাই বোন লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতি আমার শপথ/ আমি প্রতিশোধ নেবো/ আমার রক্ত ও শ্রম দিয়ে/ এই বিশ্বের মাটি ও মানুষের দেখা/ সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জঘন্য হত্যার আমি প্রতিশোধ নেবো।’ এই সংশপ্তক প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে কবির ইস্পাতকঠিন প্রতিশোধ-অভীপ্সা; এই জঘন্য হত্যার প্রতিশোধ তিনি নেবেনই। কারণ এই হত্যাকাণ্ড ‘বিশ্বের মাটি ও মানুষের দেখা/ সবচেয়ে মর্মস্পর্শী জঘন্য হত্যা’। বঙ্গবন্ধু জন্মশতবর্ষেও তিনি বেশ কিছু কবিতা লিখেছেন। ‘স্তব্ধতা যারা শিখে গেছে’ শীর্ষক কাব্যগ্রন্থে সেসব কবিতা সংকলিত হয়েছে। গ্রন্থনার বাইরেও তাঁর আরও কিছু কবিতা পত্রপত্রিকার পাতায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।
আমরা জানি পঁচাত্তর-উত্তর বৈরী সময়ে চট্টগ্রামে বসবাস করেও কবি মিনার মনসুর অসীম সাহসের পরিচয় দেন। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখার পাশাপাশি কবিবন্ধু দিলওয়ার চৌধুরীকে নিয়ে যৌথভাবে সম্পাদনা করেন ‘শেখ মুজিব একটি লাল গোলাপ’ (১৯৭৯) শীর্ষক প্রতিবাদী সংকলন। তাঁর এই সংকলনে দুই বাংলার কবিদের কবিতাই গ্রন্থিত হয়। সম্পাদক মিনার মনসুরের কবিতাটির শিরোনাম ‘নিষিদ্ধ সংলাপ’। এই কবিতার শুরুতেই কবি আত্মপরিচয় উন্মোচনের ঢঙে তুলে আনেন নিষিদ্ধ সময়ের বাস্তব চিত্র। কবির উচ্চারণ : ‘কে? কে তুমি অবাধ্য যুবক?/ ঘাতকের রক্তাক্ত খড়্গ উপেক্ষা করে/ এ রকম ভয়ানক কার্ফুর রাতে/ নিষিদ্ধ স্লোগান কণ্ঠে, নির্বিকার/ ছুটে যাও জ¦লন্ত কামানের মুখে!’ প্রতিবাদী এই কবি কবিতাটি শেষ করেছেন এভাবে : ‘আহারে অভিজ্ঞ ঘাতক!/ তুমিও তো পেশাদার খুনি – দোহাই তোমার/ আমাকে খণ্ডিত করো, আমাকে মুক্ত করো/ বক্ষ চিরে কেড়ে নাও মুজিবের নাম/ রক্ত থেকে একবার শুধু মুছে দাও/ পিতার অহংকারী বীর্যের দাগ/ নয়তো আমিও মুজিব হবো/ আমিও বিক্ষোভ হবো/ প্রতিটি উজ্জ্বল কালো রাতে, আমিও/ ছুটে যাবো রক্তাক্ত, পিচ্ছিল পথে।’
চেতনা ও প্রেমে বঙ্গবন্ধুর আরেক লড়াকু সৈনিক কবি তারিক সুজাত। বাংলাদেশ সৃষ্টির পরপরই পথহারানো বাংলাদেশের ছবি এঁকেছেন তিনি গভীর বেদনা ও গ্লানির সঙ্গে। ‘আমি আমার আঁতুড়ঘরে পথ হারালাম’ শীর্ষক কবিতায় তাঁর উচ্চারণ : ‘আমি আমার পাষাণহৃদয় কুঠার দিয়ে শিকড় কাটি/ হত্যাকারীর মুখটিও যে আমার মুখের ছাঁচে গড়া/ আমি আমার নাড়ি দিয়ে তৈরি করি গলার ফাঁসি/ খুনে-রাঙা হাতটিও যে দেখতে আমার হাতের মতোই/ আমি আমার আঁতুড়ঘরে আগুন জ্বেলে/ মুখ পোড়ালাম’। কবির এই আত্মধিক্কার ও গ্লানি বঙ্গবন্ধুপ্রেমী সমগ্র বাঙালির সামষ্টিক উচ্চারণে পরিণত হয়।
তারিক সুজাতের সমসাময়িক কবি সাজ্জাদ আরেফিন। তিনি ‘রূপকথার গল্প’ শীর্ষক তাঁর নিবেদিত কবিতায় বঙ্গবন্ধুর ছবি এঁকেছেন প্রতীকের আশ্রয়ে। তাঁর কাছে বঙ্গবন্ধু এক ‘রূপকথার দয়ালু রাজা’। কবির ভাষায় : ‘রূপকথার দয়ালু রাজা/ এক বিশাল পুরুষ/ যাঁর আশ্চর্য আলোয়/ ছায়ায়/ একটি দেশ/ হোক আগাছা/ তবু এদেশের/ আলো/ বাতাস/ জলের ঋণ ভুলে যাবে/ ভাবেননি তিনি – / পবিত্র সুবেহ সাদেক ঢেকে যায়/ ভয়াল অন্ধকারে/ রাজা নেই/ একটি মানচিত্র থরথর কাঁপে।’
নব্বইয়ের প্রতিনিধিত্বশীল কবি মুজিব ইরম। বঙ্গবন্ধু শেখ ‘মুজিব’-এর নামের সঙ্গে নিজের নামের সাদৃশ্যকে গভীর সংবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে তাঁর যে উচ্চারণ, তা আমাদের গভীর বেদনাবোধে আক্রান্ত করে। ‘আমারও কি তবে একবার মৃত্যু হয়েছিল আগস্টের রাতে?/ এ দেহের কেন আজও জানাজা হলো না!/ পিতামহ জানে/ জন্মভোরে তোমার নামের ধ্বনি কান্না হয়ে বাজে নালিহুরী গ্রামে।/ আমারও কি তবে বাস ছিল টুঙ্গিপাড়ায়?/ এ নামের কলঙ্ক রবে – ধানমন্ডি বত্রিশের নামে যদি না রচি আজ/ কান্নার জিকির।’
লেখার কলেবরের কথা ভেবে বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত কবিতার আলোচনার এখানেই রাশ টানতে হচ্ছে। তবে কিছু কবির নাম উল্লেখ না করে পারছি না, যাঁরা রাজনীতির এই মহান কবিকে নিয়ে লিখেছেন অসাধারণ সব কবিতা। এ তালিকায় আছেন কবি আবুল হোসেন, মাহবুব উল আলম চৌধুরী, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, হাসান হাফিজুর রহমান, কায়সুল হক, দিলওয়ার, ফজলুল হক সরকার, হায়াৎ মামুদ, মনজুরে মওলা, সিকদার আমিনুল হক, রবিউল হুসাইন, মোহাম্মদ রফিক, মহাদেব সাহা, আবু কায়সার, মাহমুদ আল জামান, রুবী রহমান, হাবীবুল্লাহ সিরাজী, হুমায়ুন আজাদ, অসীম সাহা, আবিদ আনোয়ার, ময়ুখ চৌধুরী, মুজিবুল হক কবীর, মাসুদুজ্জামান, ফারুক মাহমুদ, বিমল গুহ, হালিম আজাদ, মোহাম্মদ সাদিক, হাসান হাফিজ, গোলাম কিবরিয়া পিনু, ফরিদ আহমদ দুলাল, সোহরাব পাশা, মাহমুদ কামাল, আসাদ মান্নান, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, আবু হাসান শাহরিয়ার, হারিসুল হক, কামরুল হাসান, ফেরদৌস নাহার, মারুফ রায়হান, খালেদ হোসাইন, তপন বাগচী, বায়তুল্লাহ কাদেরী, মিহির মুসাকী, শামীম রেজা, সাইমন জাকারিয়া, মাসুদ পথিক-সহ ষাট, সত্তর, আশি, নব্বই, প্রথম বা শূন্য দশক, এমনকি দ্বিতীয় দশকের কবিরাও। এসব কবিতায় বঙ্গবন্ধুর স্বভাববৈশিষ্ট্য অর্থাৎ চারিত্রিক দৃঢ়তা, সত্য ও ন্যায়ের প্রতি নিঃশঙ্ক অবস্থান, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, অদম্য সাহস, জনমানুষের প্রতি গভীর আস্থা ও তীব্র ভালোবাসা ফুটে উঠেছে। বঙ্গবন্ধু এমন এক ব্যক্তিত্ব যাঁকে কেন্দ্র করে বাংলা ভাষাসহ নানা ভাষার কবিরা আরও অজস্র কবিতা রচনা করবেন। কারণ বঙ্গবন্ধুর মতো মহান রাজনীতিকের জন্মের জন্যে কোনো জাতিকে হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয়।
পরিশেষে বলতে চাই, বঙ্গবন্ধুকে নিবেদিত অজস্র কবিতা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে পত্রপত্রিকার পাতায় ও বিভিন্ন সংকলনে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এমন এক নেতা যাঁকে নিয়ে সমকাল তো বটেই উত্তর-প্রজন্মও নিবেদিত কবিতায় তাঁর অসামান্য অবদানের কথা তুলে আনবেন। কারণ এই মহান বাঙালির কোনো মৃত্যু নেই। তিনি আমাদের কাছে এক মৃত্যুঞ্জয়ী অবিনাশী মানবসত্তা।

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field
    X