চিত্রকলা বিশেষ সংখ্যা শিল্পকলা

জাহিদ মুস্তাফা | চারুশিল্পে বঙ্গবন্ধু | শিল্পকলা

হাজার বছরের শোষণ-নিপীড়নে জর্জরিত বাঙালির ঘোর অমানিশায় আশার আলোকবর্তিকা হয়ে বাংলায় তাঁর জন্ম ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ । আমাদের জীবনকালের সবচেয়ে আলোচিত মহান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, বাঙালির প্রিয় অভিভাবক, প্রিয় নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর সংগ্রামী জীবনের সঙ্গে যেমন জড়িয়ে আছে বাংলাদেশ তেমনই এ দেশের সবক্ষেত্র তাঁর স্বপ্নকে ঘিরে ও তাঁর আদর্শকে জড়িয়ে অগ্রসরমান।
বাংলাদেশের চারুশিল্পীদের সাথে বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধুর নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে। ষাটের দশকে বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বঙ্গবন্ধু যখন রাজনীতির মঞ্চ কাঁপিয়ে তুলছেন, চারুশিল্পীরা তখন তাঁদের নানা চিত্রকর্ম, ব্যানার পেইন্টিং, কার্টুন, পোস্টার প্রভৃতির মাধ্যমে গণমানুষের প্রতিবাদের শক্তি এবং জাগরণের প্রেরণা সঞ্চার করেছেন। বঙ্গবন্ধু যখন বাঙালির অধিকার আদায়ের সংগ্রাম সংগঠিত করছিলেন, তখন বিভিন্ন পেশাজীবির মতো চারুশিল্পীদের সঙ্গেও বঙ্গবন্ধুর সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু বাঙালির মুক্তির সনদ ছয়দফা ঘোষণা করেন। শিল্পী হাশেম খান সেই ঘোষণাপত্রের নকশা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু সেই নকশা অনুমোদন করেন এবং সে অনুযায়ী মঞ্চ নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন। শিল্পী হাশেম খানের আঁকা নকশায় তখনকার শিক্ষার্থীশিল্পী বীরেন সোম, আবুল র্বাক আল্ভী ও মঞ্জুরুল হাই ছয় দফার মঞ্চ নির্মাণ করেন।
১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুসহ রাজবন্দিদের মুক্তি ও বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সমর্থনে বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ বাংলা একাডেমিতে এক সভার আয়োজন করে। শিল্পী কামরুল হাসান সে সভায় বক্তৃতা করে গণআন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। এই বছরেরই ফেব্রুয়ারিতে বাংলা একাডেমির বটমূলে তিনি অক্ষরবৃক্ষের উদ্বোধন করেন।
ওই বছরের একুশে ফেব্রুয়ারির শ্লোগান ছিল ‘আজ পলাশ ফোটার দিন’। শহিদ মিনারে শুধু ফুলের বলয় দেয়ার পরিবর্তে স্বরবর্ণের প্রথম দুই অক্ষর ‘অ’ আর ‘আ’ দিয়ে ফুলের বলয় এবং আন্দোলনের বার্তা বহনকারী স্বরবর্ণের ব্যানার টাঙানো হয়। চারুকলার ছাত্রসংসদ এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল। প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের অনেকেই এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ আয়োজনের পাণ্ডুলিপি রচনা করেছিলেন শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার, রফিকুন নবী ও শাহাদাত চৌধুরী।
সে সময়ের বিশিষ্ট শিল্পী ও শিক্ষার্থীশিল্পীদের অনেকেই ছবি এঁকে, শত-সহস্র ব্যানার পোস্টার এঁকে লিখে ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে সংগঠিত ও বেগবান করেছেন। তাঁরা হলেন- ইমদাদ হোসেন, কাইয়ুম চৌধুরী, দেবদাস চক্রবর্তী, হাশেম খান, সাংবাদিক মতিউর রহমান, আনোয়ার হোসেন, কেরামত মওলা, হাসান আহমেদ, প্রফুল্ল রায়, গোলাম সারোয়ার, নাসির বিশ্বাস, রেজাউল করিম, আবদুল মান্নান, লুৎফর রহমান, সৈয়দ আবদুল্লাহ খালিদ, বিজয় সেন, বীরেন সোম প্রমুখ শিল্পী ও শিল্পশিক্ষার্থী। শিল্পীদের এসব কাজে অনুপ্রেরণা যোগাতেন শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, শিল্পী কামরুল হাসান, শিশুসাহিত্যিক এখলাসউদ্দিন আহমেদ, সাংবাদিক মতিউর রহমান, মাহফুজ আনাম, আবুল হাসনাত, মফিদুল হক প্রমুখ।
একুশে ফেব্রুয়ারির দুইদিন আগে ব্যানারগুলো আঁকা হতো সারারাত জেগে। আঁকতেন মুস্তাফা মনোয়ার, রফিকুন নবী, হাশেম খানসহ অন্যান্য শিল্পীরা। লেখার কাজ করতেন বীরেন সোম, লুৎফর রহমান, একেএম মাহতাব ও জিএমএ রাজ্জাক। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও রশিদ চৌধুরী তাঁদের বাসায় দু’টি ব্যানার এঁকে দিয়েছিলেন। আবেদিনের আঁকা ব্যানার এখলাসউদ্দিন আহমদের সংগ্রহে ছিল।
বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয়দফার সাথে ছাত্রসমাজের কতক দাবি যুক্ত করে ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতৃত্বে ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ এগারো দফা প্রণয়ন করে যে আন্দোলন গড়ে তোলে তাতে ওই শিক্ষার্থী-শিল্পীরা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত ছিলেন। আর্টকলেজ হোস্টেলে প্রতিরাতে অন্তত পাঁচশ করে পোস্টার লেখা হতো। উল্লেখিত শিল্পী ছাড়াও এ কাজে যুক্ত হয়েছেন – শহিদ কবির, স্বপন চৌধুরী, অলক রায়, হাসি চক্রবর্তী, মনসুর-উল করিম, ওয়াদুদ, মোফাজ্জলসহ অনেকেই। ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে এই কাজের সমন্বয় করতেন ডাকসুর সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসাদুজ্জামান নূর।’
বাংলাদেশের আধুনিক চারুশিল্পের প্রাণপুরুষ শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের সাথে তাঁর সম্পর্কের গভীরতা আমরা উপলব্ধি করি নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘৬৫ পরবর্তী শেখ মুজিবুর রহমানের ছয়দফা দাবি ও ‘৬৯-এর গণআন্দোলনের একধরনের ফলশ্রুতি জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে আয়োজিত ‘নবান্ন’ চিত্র প্রদর্শনী ও ‘সোনার বাংলা শ্মশান কেন’ শ্লোগানের সমধর্মী সাহসী শিল্পকর্ম ৬৪ ফুট দীর্ঘ স্ক্রল চিত্র। ’৭০-এর উপকূলীয় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস প্রভাবিত ৩০ ফুট দীর্ঘ স্ক্রলটিকেও রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা যায়, মানবিক বক্তব্য তো অবশ্যই।’
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষণায় বাংলার শিল্পীসমাজ তুমুল আলোড়িত হন। ‘৭ মার্চের পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে ২৪ মার্চ বিক্ষুদ্ধ শিল্পী সমাজের স্বাধীনতা শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়েছেন জয়নুল ও তাঁর সতীর্থরা। মিছিলের অগ্রভাগে হাশেম খানের হাতে লেখা চারটি অক্ষর ‘স্বা ধী ন তা’ ধরে অংশ নিয়েছিলেন যথাক্রমে সুলতানা কামাল লুলু, সাথী, ফেরদৌসী পিনু ও সাঈদা কামাল টুলু।’
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়লাভের পরেও বাঙালির জয় অসম্পূর্ণ থেকে যায়- বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতির কারণে। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু ঢাকায় ফিরে এলে বাঙালির বিজয়ের আনন্দ পরিপূর্ণতা লাভ করে। আমি তখন টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী বালক বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। সুযোগ পেলে ছবি-টবি আঁকি। রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্তের প্রতিকৃতি আঁকার চেষ্টা করি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের পর পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে কাগজে কাঠপেন্সিল দিয়ে নবীশ হাতে তাঁর ভাষণের ছবি এঁকে আমাদের ঘরে টাঙ্গিয়ে রেখেছিলাম। স্বাধীনতার পর রংপেন্সিলে বঙ্গবন্ধুর আরো অনেক প্রতিকৃতি এঁকেছি আমি, সহপাঠী অসীম রায়সহ বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষার্থী।
১৯৬৯ সালের গণআন্দোলনের পর ঝিনাইদহের বালক আজকের বিশিষ্ট চিত্রকর শেখ আফজাল বঙ্গবন্ধুর ছবি এঁকেছিলেন। এক জনসভায় যোগ দিতে সেবার বঙ্গবন্ধুর কুষ্টিয়ার হরিনারায়ণপুর আগমন। সেই জনসভায় ১০ মিনিটের মতো বক্তৃতা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। মঞ্চে বসে বালক আফজাল তাঁর প্রতিকৃতি এঁকে বঙ্গবন্ধুকে উপহার দেন। বঙ্গবন্ধু তাঁকে সস্নেহে কাছে টেনে নিয়ে বড় হলে আর্ট কলেজে পড়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। এর কয়েক বছর পর প্রায় অনুরূপ ঘটনা ঘটে শিল্পী আজকের বিশিষ্ট শিল্পী শিশির ভট্টাচার্যের ক্ষেত্রে! ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর ঠাকুরগাঁ সফরকালে কিশোর শিশির ভট্টাচার্য পেন্সিলে তাঁর প্রতিকৃতি এঁকে বঙ্গবন্ধুকে উপহার দিয়েছিলেন।
অভিজাত শিল্পীদের হাতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি অংকনের আগেই লোকশিল্পীরা তাঁকে একটি মহান চরিত্রে পরিণত করেছে। এর প্রমাণ মেলে সেসময়ের নানা প্রকাশনায়। ১৯৭২ সালে কলকাতা থেকে মুদ্রিত অনেক ছবি, ক্যালেন্ডার ও ভিউকার্ড বাংলাদেশে আসতে থাকে। সেগুলোতে পাশের দেশের সাধারণ শিল্পীদের আঁকা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি আমরা দেখেছি। এদেশের সাইনবোর্ড ও রিকসাচিত্র আঁকিয়ে শিল্পীরা ভালোবেসে সশ্রদ্ধায় বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিসহ নানা ঘটনার চিত্র এঁকেছেন। জীবদ্দশায় লোকশিল্পের পছন্দের চরিত্র হয়ে ওঠা ইতিহাসে বিরল! বঙ্গবন্ধুর নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বাঙালি প্রথমে হতচকিত ও স্তম্ভিত হলেও লোকশিল্পীরা সেই শোক সামলে আরো তুমুল উদ্যোগে নিষিদ্ধ বঙ্গবন্ধুকে সশ্রদ্ধায় জনমানসের সামনে তুলে এনেছেন।
বিশ্বের প্রায় সব দেশের ধাতব বা কাগজের মুদ্রায় ও ডাকটিকেটে সেদেশের প্রতিষ্ঠাতার প্রতিকৃতি ব্যবহার করা হয় জাতীয় পরিচিতি তুলে ধরতে। ‘বঙ্গবন্ধুর ওপর প্রথম ডাকটিকেট প্রকাশিত হয় বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্তে মুক্তিযুদ্ধকালে ১৯৭১ সালের ২৯ জুলাই। পাঁচ রুপি মূল্যমানের এই ডাকটিকেটটির নকশাকার লন্ডনপ্রবাসী শিল্পী বিমান মল্লিক। বিজয় লাভের পর একই ডাকটিকেটে বাংলায় ‘বাংলাদেশের মুক্তি’ ও ইংরেজিতে ইধহমষধফবংয খরনবৎধঃবফ কথা ছেপে দেয়া হয়। ১৯৯৬ সালের ১৫ আগস্ট জাতীয় শোকদিবসে বঙ্গবন্ধুর ছবি সম্বলিত ৪ টাকা মূল্যমানের ডাকটিকেট প্রকাশিত হয়; যেটির নকশাকার মতিউর রহমান। বাংলাদেশ ডাক বিভাগ বঙ্গবন্ধুর জীবন, আদর্শ ও কর্মকে স্মরণীয় ও বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে এ পর্যন্ত ৪৪টি স্মারক ডাকটিকেট, ১২টি স্যুভেনির সিট, ৪৬টি উদ্বোধনী খাম, ৪টি বিশেষ খাম ও সিলমোহর, ২টি ফোল্ডার, ১টি ইনফরমেশন সিট, ৮টি অ্যারোগ্রাম ও ৫ প্রকারের পোস্টকার্ড প্রকাশ করেছে।’
বাংলাদেশের কাগজি মুদ্রায় একমাত্র বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির ছাপ স্থান পেয়েছে। তাঁর প্রতিকৃতির ছাপ প্রথম মুদ্রিত হয় ১৯৭২ সালের ২ জুন দশ টাকা মূল্যমানের কাগজি মুদ্রা বা নোটে। একই বছরের ১৫ অক্টোবর একই নকশায় বঙ্গবন্ধুর ছবি সম্বলিত ১০ টাকার আরেকটি নোট বের হয়। প্রথমটির মুদ্রক থমাস ডিলারু ও পরেরটির মুদ্রক ব্রাডব্রুরি উইলকিংসন অ্যান্ড কোম্পানি। ১ সেপ্টেম্বর একশত টাকার একটি নোট বের হয় থমাস ডিলারুর মুদ্রণে। পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন বহুরৈখিক অংকনে আঁকা বঙ্গবন্ধুর ছবি সম্বলিত নোট বের হয়। এরপর আশির দশক থেকে ঢাকার অদূরে গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত সিকিউরিটি প্রিন্টিং প্রেসের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুদ্রা ছাপা হচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানে শিল্পীদের সৃজন ও অলংকরণের দুর্লভ অবদান রাখার ঐতিহাসিক সুযোগ করে দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। শিল্পাচার্যের নেতৃত্বে সংবিধান অলংকরণ দলে ছিলেন- শিল্পী একেএম আবদুর রউফ, জুনাবুল ইসলাম, সমরজিৎ রায় চৌধুরী, হাশেম খান ও আবুল র্বাক আল্ভি। শিল্পী আবদুর রউফ তখন লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে কর্মরত ছিলেন। তিনি পুরো সংবিধানটি হাতে লেখেন, আর এর অঙ্গসজ্জা করেন শিল্পী হাশেম খান। এর কভার করা হয় চামড়ায় বাটিকের মাধ্যমে। আর পোস্তানি করা হয় শিল্পাচার্যের সংগ্রহে থাকা নকশিকাঁথার নকশা ব্যবহার করে। সংবিধানে জয়নুলের আঁকা ড্রয়িংগুলোর বিষয় বাংলাদেশের জনজীবন। যেমন – ধান কেটে কাঁধে নিয়ে বাড়ি ফেরা, স্রোতের বিপরীতে মাঝির গুণটানা, গরু চড়িয়ে রাখালের ঘরে ফেরা, নৌকাবাইচ, কাদায় আটকে পড়া গরুর গাড়ি টেনে তোলা দড়িবাঁধা মা গাভী ও চঞ্চল বাছুর প্রভৃতি।
বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এর পুনর্গঠনের তুমুল ব্যস্ততা সত্ত্বেও তিনি দেশবরেণ্য নাগরিকদের মর্যাদাপূর্ণ পদে নিযুক্তি দেয়ার কর্তব্য বিস্মৃত হননি! ১৯৭২ সালের ২১ নভেম্বর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনকে তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতি নিযুক্ত করেন। ১৯৭৪ সালের ২০ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৩ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিজিটিং প্রফেসর পদ লাভ করেন। স্বাধীন দেশের শিল্প ও সংস্কৃতি বিকাশের কথা ভেবে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পরামর্শক্রমে ১৯৭৪ সালে আর্ট কাউন্সিলের পরিবর্তে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৭৪ সালেই ২০ জুলাই জয়নুল আবেদিনকে জাতীয় অধ্যাপক পদে নিযুক্তির নথিতে বঙ্গবন্ধু স্বাক্ষর করলে, ১৯৭৫ সালের ১৭ মার্চ এই নিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি প্রজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়।
বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনায় শিল্পাচার্যের আরাধ্য দু’টি প্রতিষ্ঠান সোনারগাঁয় লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং ময়মনসিংহে জয়নুল সংগ্রহশালা গড়ে ওঠেছিল যথাক্রমে ১৯৭৫ সালের ১২ মার্চ এবং ১৯৭৫ সালের ১৪ এপ্রিল।
১৯৭১ সাল থেকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি ও বেসরকারি আয়োজনে চারুশিল্পীরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসংখ্য প্রতিকৃতি এঁকেছেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম বীর মুক্তিযোদ্ধা শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ ও শিল্পী আবদুল মান্নান, যিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের শিল্পনির্দেশক ছিলেন। ‘শাহাবুদ্দিন বঙ্গবন্ধুর প্রথম প্রতিকৃতি আঁকেন মুক্তিযুদ্ধকালে ভারতের মেলাঘরে জঙ্গলে প্রশিক্ষণ শিবিরে কাজলের কালি দিয়ে! এরপর ১৯৮৮ সালে তিনি প্যারিসে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি আঁকেন। প্যারিসের পার্কে একটি মিউজিয়ামে তরুণ ও প্রসিদ্ধ মিলিয়ে দু’শ চিত্রকরের আঁকা প্রতিকৃতি নিয়ে এ প্রদর্শনীর আয়োজন হয়। শাহাবুদ্দিন ভাবলেন, যে মানুষটি দেশ বানালো, তাঁকেই মেরে ফেলা হলো! তিনি স্থির করলেন তাঁকেই আঁকবেন, সাত মার্চের টাইগার অব বেঙ্গল আঁকবেন; তাঁর প্রিয় মানুষটিকে এখানে দেখাবেন। এই চিন্তা করেই বঙ্গবন্ধুকে আঁকলেন, ছবিটা পাঠালেন। প্রদর্শনী উদ্বোধনের দিনে তিনি যেয়ে দেখেন তাঁর আঁকা বঙ্গবন্ধু প্রধান জায়গায়। কেউ ভাবছেন এটি এন্থনি কুইনের ছবি, কেউ ভাবলো ক্যাথলিকদের ফাদার। সেই প্রদর্শনীতে একটাই ছবি বিক্রি হয়েছিল, সেটি ‘টাইগার অব বেঙ্গল’।
তারপর থেকে শিল্পী শাহাবুদ্দিনের চিত্রপটে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবয়ব অসংখ্যবার এসেছে। বঙ্গবন্ধুর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে তাঁর আঁকা গুলিবিদ্ধ হয়ে লুটিয়ে পড়া চিত্র আমাদের বিবেকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়। শাহাবুদ্দিনের তুলি-চালনার প্রবল গতিময়তা বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের দৃঢ় ও সংবেদী চরিত্রের সাথে এমন মিলে গেছে যা এই শিল্পীকে অতুলনীয় করেছে।
‘পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের দিনে তাঁকে স্বাগত জানাতে শিল্পী আবদুল মান্নানের আঁকা বঙ্গবন্ধুর বড় একটি প্রতিকৃতি বিমানবন্দরে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয়। এর কয়েকদিন পর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের তৎকালীন জেলার শামসুর রাহমানের আগ্রহে জিরাজ আর্ট গ্যালারির স্বত্বাধিকারী আফতাব আহমেদ ও শিল্পী ইয়াকুবের অনুরোধে তিনি বঙ্গবন্ধুর ফুলফিগার একটি প্রতিকৃতি চিত্র আঁকেন। কেন্দ্রীয় কারাগারের যে সেলটায় বঙ্গবন্ধুর বন্দীজীবন কেটেছে সেখানে এটি স্থাপন করা হয়েছিল। পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর সে চিত্রের হদিস আর পাওয়া যায়নি।
১৯৭৫ সালের ১৮ মে বঙ্গবন্ধু রামপুরায় টেলিভিশন ভবনে এসেছিলেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা, দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা. কনিষ্ঠ পুত্র শেখ রাসেল। সেদিন জাতির পিতাকে স্বাগত জানাতে শিল্পী মান্নান তাঁর প্রতিকৃতি এঁকেছিলেন, সযত্নে শিল্পসম্মতভাবে সেটির ফ্রেমনকশা করেন শিল্পী ইমদাদ হোসেন। একই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনের মঞ্চে স্থাপনের জন্য শিল্পী আনোয়ার হোসেনের পরিকল্পনায় শিল্পী মান্নান ১২ গুণিতক ১২ ফুট গোলাকার চিত্রপটে বঙ্গবন্ধুর বিশাল এক প্রতিকৃতি আঁকেন।
সেসময় টেলিভিশন অনুষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দৃশ্যপট নির্মাণের জন্য বঙ্গবন্ধুর কয়েকটি প্রতিকৃতি এঁকেছেন শিল্পী আবদুল মান্নান। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু জুলিওকুরি শান্তি পদকে ভূষিত হলে টেলিভিশন অনুষ্ঠানের জন্য শিল্পী মান্নান তাঁর আরেকটি প্রতিকৃতি আঁকেন। বঙ্গবন্ধু হত্যার মর্মন্তুদ ঘটনার পর টেলিভিশনে থাকা তাঁর আঁকা সেই প্রতিকৃতি গ্রন্থাগারিক কোহিনূর বেগমের সহায়তায় শিল্পী সযত্নে টেলিভিশন গ্রন্থাগারে সংরক্ষণ করেন। ১৯৯৬ সালের জুন মাসে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হলে সেই ছবি টেলিভিশন লাউঞ্জে পুনঃস্থাপন করা হয়।
গ্রন্থ ও পত্র-পত্রিকায় প্রকাশের জন্য বঙ্গবন্ধুর জীবদ্দশায় দেশের স্বনামধন্য চিত্রশিল্পীদের পাশাপাশি তরুণশিল্পীরাও তাঁর প্রতিকৃতিসমেত প্রচ্ছদ এঁকেছেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতার নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর ভীতসন্ত্রস্ত্র পুরো জাতির মতো শিল্পীসমাজও স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। রাষ্ট্রক্ষমতার অবৈধ দখলের মধ্য দিয়ে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রে মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের প্রধান নেতাদের হত্যা, নানা ষড়যন্ত্রমূলক ঘটনার মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা করে বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্যকেই ব্যাহত করা হয় এবং বাংলাদেশবিরোধীদের পুনর্বাসন করা হয়।
চরম এ দুঃসময়ে বাংলাদেশের শিল্পীসমাজ বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার কর্তব্য পালন করেন। ‘আশির দশকের শুরু থেকে শিল্পী আবদুল মান্নান তাঁর সহপাঠী ও সহকর্মী শিল্পী একেএম মাহতাবকে সাথে নিয়ে সুকৌশলে কাঠ ও অ্যালুমনিয়াম ফয়েলসিট দিয়ে তৈরি রবীন্দ্র-নজরুলের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সারাদেশে ছড়িয়ে দেন। কারুকলার হাত ধরে স্বল্পমূল্যে মানুষের ঘরে ঘরে আবার পৌঁছে যান বঙ্গবন্ধু।’
বাংলাদেশের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুছে ফেলার হাজারো অপচেষ্টা সত্ত্বেও মানুষের হৃদয়ে তাঁর অবস্থান চিরঅম্লান। বাঙালির এই মহানায়ক তাঁর নির্মম মৃত্যুর পর অনেক শক্তি নিয়ে আবির্ভূত হয়েছেন জাতির সামনে। আমাদের চিত্রকর, কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিসেবী-সাংবাদিকেরা এই সত্য তুলে ধরেছেন সাধারণের কাছে তাঁদের আঁকায়-লেখায় গানে-নাটকে-পত্র-পত্রিকার পাতায় কলামে।
আশির দশকের প্রথমভাগ থেকে দেশের বিশিষ্ট শিল্পীদের চিত্রপটে স্বমহিমায় আভির্ভূত হন শেখ মুজিবুর রহমান। অগ্রজ শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী জলরঙে বঙ্গবন্ধুর বেশ কিছু প্রতিকৃতিসহ বাংলার প্রকৃতিতে তাঁকে স্থাপন করে বেশ কয়েকটি ছবি এঁকেছেন। নৌকার গলুইয়ে বসে গালে হাত রেখে গভীর ভাবনারত বঙ্গবন্ধুর চিত্র দর্শক হৃদয়কে আপ্লুত করে।
ভাবনারত বঙ্গবন্ধুর এই ছবির সাথে বাংলার প্রকৃতির নানা বৈশিষ্ট্যকে মিলিয়ে শিল্পী সমরজিৎ রায় চৌধুরী আরেকটি চিত্র এঁকেছিলেন গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। তাঁর আঁকা বঙ্গবন্ধুর একটি প্রতিকৃতিচিত্র গণভবনে সংরক্ষিত আছে। এ ছাড়াও বর্ষিয়ান এই শিল্পী সম্প্রতি শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষে অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচা অবলম্বনে বাংলাদেশের শতাধিক চিত্রকরের অংকনে বঙ্গবন্ধুর সচিত্র জীবন-ইতিহাস রচনার জন্যেও ছবি এঁকেছেন।
শিল্পী হাশেম খান বঙ্গবন্ধু ঘোষিত ছয়-দফার আন্দোলনের সূচনা থেকে সৃজনশিল্পীর কর্তব্য পালন করে চলেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস সৃষ্টিকারী ভাষণকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন সময়ে তিনি বেশ কয়েকটি চিত্র রচনা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর সংকল্পবদ্ধ দৃঢ় চোয়াল, উত্তোলিত ডানহাতের তর্জনি ছুড়ে বাঙালির মুক্তি ও স্বাধীনতার ঘোষণার চিত্র শিল্পী সার্থকভাবে তুলে ধরেছেন।
শিল্পী রফিকুন নবীর চিত্রকর্মে বঙ্গবন্ধু, বাংলার গণআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ এসেছে নানা প্রেক্ষিত নিয়ে। গণমানুষের প্রিয়নেতার প্রতিকৃতি চিত্রাংকনে তিনি বঙ্গবন্ধুর অবয়বের মাধুর্যকে তাঁর ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তার সঙ্গে সমন্বয় করায় সার্থক হয়েছেন। দু’বার তিনি বঙ্গবন্ধুর সান্নিধ্য পেয়েছেন। তাঁকে কাছে থেকে দেখার সাথে গণমানুষের নেতা হিসেবে তাঁর প্রতি অমোঘ আকর্ষণ আমরা পেয়ে যাই নবীর আঁকায়।
শিল্পী মনিরুল ইসলাম বঙ্গবন্ধুকে তাঁর পরিপার্শ্ব প্রয়োগ করে প্রতীকের মাধ্যমে চিত্রিত করেছেন। শিল্পী শহিদ কবির, আবদুস শাকুর শাহ, শিল্পী রণজিৎ দাস, ফরিদা জামান, নাসিম আহমেদ নাদভী, মোহাম্মদ ইউনুস, রোকেয়া সুলতানা বঙ্গবন্ধুকে আঁকতে যেয়ে প্রতীকের আশ্রয় নিয়েছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা চিত্রকর বীরেন সোম বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ শিরনামে সম্প্রতি একক চিত্র প্রদর্শনী করেছেন।
ভাস্কর ও চিত্রকর হামিদুজ্জামান খান ৭ মার্চের ভাষণদানরত বঙ্গবন্ধুর তর্জনীর দৃঢ়তা তুলে ধরেছেন তাঁর সৃজনে। শিল্পী জামাল আহমেদ বঙ্গবন্ধুর ভাষণদানের চিত্র ছাড়াও তাঁর অবয়বনির্ভর বেশ কিছু ছবি এঁকেছেন। শিল্পী অলকেশ ঘোষ বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি চিত্র এঁকেছেন চল্লিশটির মতো। গণভবনসহ নানা সরকারি দপ্তরে তাঁর আঁকা এসব চিত্রকর্ম দেখা যায়। শিল্পী আনোয়ার হোসেন, শিল্পী বিপদভঞ্জন সেন কর্মকার, শিল্পী চন্দ্রশেখর দে, শিল্পী রেজাউল করিম, শিল্পী মানিক দে, শিল্পী সমর মজুমদার বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিসহ তাঁর জীবনের নানা ঘটনাবলির চিত্র তুলে ধরেছেন।
শিল্পী তরুণ ঘোষ, রেজাউন নবী, কনক চাঁপা চাকমা, মনিরুজ্জামান, আইভি জামান, মোখলেসুর রহমান, আফরোজা জামিল কংকা, কামালপাশা চৌধুরী, রফি হক, ড. মোহাম্মদ ইকবাল, মিনি করিম, নাসিমা খানম কুইনি, মাসুদ কবির, প্রদ্যোত কুমার দাস, ফারুক আহমেদ মোল্লা, নাজিব তারেক, সুনীল কুমার পথিক প্রমুখ শিল্পী বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের নানা বিষয় নিয়ে ছবি এঁকেছেন। ১৯৯৬ সালে শিল্পকলা একাডেমিতে স্থাপনাশিল্প কালরাত্রির মাধ্যমে শিল্পী অশোক কর্মকার বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে জনমানসে তুলে ধরেছেন। আমি নিজেও বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিকেন্দ্রিক কয়েকটি চিত্রাঙ্কন করেছি। এর অন্তত দু’টি চিত্রকর্ম শিল্পকলা একাডেমির সংগ্রহে আছে; অন্যান্য শিল্পীদের আঁকা-গড়া শিল্পকর্মের সঙ্গে।
শিল্পী আহমেদ শামসুদ্দোহা, শেখ আফজাল, মাকসুদুল আহসান, কিরিটিরঞ্জন বিশ্বাস, শাহজাহান আহমেদ বিকাশ, আলপ্তগীন তুষার প্রতিকৃতি চিত্রাঙ্কনে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে আসছেন। তাঁরা সবাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অসংখ্য ছবি এঁকেছেন। আহমেদ শামসুদ্দোহা ও শেখ আফজালের অংকিত বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতির প্রতিটি কোণে শিল্পীর সযত্ন প্রয়াস এক্ষেত্রে তাঁদের নৈপুণ্য তুলে ধরে। বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি নিয়ে শিল্পী শাহজাহান আহমেদ বিকাশ ও কিরীটি রঞ্জন বিশ্বাসের দু’টি একক চিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন প্রশংসিত হয়েছে।
ভাস্কর্যে বঙ্গবন্ধু এসেছেন ভাস্কর হামিদুজ্জামান খান, মজিবুর রহমান, রাসা, শ্যামল চৌধুরী, রেজাউজ্জামান, জাহানারা পারভীন, শ্যামল সরকার, মানবেন্দ্র ঘোষ প্রমুখের সৃজনে। নানা সরকারি অফিসে শ্যামল চৌধুরীকৃত বঙ্গবন্ধুর আবক্ষ ও পূর্ণ অবয়বের ভাস্কর্য দেখা যায়। সোনারগাঁয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন প্রাঙ্গনে তাঁর ভাস্কর্যে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি ও ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তা যথাযথভাবে ফুটে ওঠেছে।
তরুণ শিল্পীদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও তাঁর প্রতি ভালোবাসার প্রতিফলন আমরা দেখি আনিসুজ্জামান, সঞ্জিব দাস অপু, ফজলুর রহমান ভুটান, শামছুল আলম আজাদ, রাশেদুল হুদা, মনিরুজ্জামান শিপু, অনুকুল চন্দ্র মজুমদার, সুশান্ত অধিকারী, রবিউল ইসলাম, কাজী শহীদ, কামালউদ্দিন, আবদুস সাত্তার তৌফিক, ময়েজউদ্দিন লিটন, বিশ্বজিৎ গোস্বামী, সুমন ওয়াহিদ, রাসেলকান্তি দাস, মো. আবদুস সোবাহান হীরা, সুমন বৈদ্য, রত্নেশ্বর সূত্রধর, সিদ্ধার্থ দে, আনিসুজ্জামান সোহেল, ফারহানা ইয়াসমিন যুঁথি, নাজমুল আহসান, জাকির হোসেন পুলক, দিদারুল হোসেন লিমন, আসমিতা আলম শাম্মি, সুরভী স্মৃতি, টুম্পা, প্রদীপ সাহা, আজমল হোসেন, দিদারুল হোসাইন লিমন প্রমুখ শিল্পীর চিত্রপটে বঙ্গবন্ধু বারবার এসেছে কখনো প্রতিকৃতির মাধ্যমে, কখনো নানা ঘটনার চিত্রবয়ানে।
জাতীয় শোকদিবসে শিল্পী আশরাফুল আলম পপলু ও শিল্পী দুলাল চন্দ্র গাইন তাঁদের সতীর্থ শিল্পীদের নিয়ে চারুকলার জয়নুল গ্যালারিতে, জাতীয় চিত্রশালায় বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অগ্রজ-অনুজ শিল্পীদের শিল্পকর্মের ধারাবাহিক প্রদর্শনীর আয়োজন করে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতির প্রতি শিল্পীদের শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। তাঁরা নিজেরাও সৃজনকর্মের মাধ্যমে জাতির পিতার মাহাত্মকে বারবার স্মরণ করেছেন।
শিল্পের আলোয় আলোকিত করে বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধুকে উপস্থাপনের কৃতিত্ব দেখিয়েছেন সংস্কৃতিজন লিয়াকত আলী লাকি। তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির নানা উদ্যোগের মাধ্যমে বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিক ও চারুশিল্পীদের একত্র করে জাতির পিতার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের পথ তৈরি করেছেন। এ ছাড়াও দেশের চারুশিল্পীদের পেশাজীবী সংগঠন বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্ত্বরে ২০১৮ সালের ১৪ আগস্ট থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ৪৩ তম শাহাদাৎ বার্ষিকীতে হাতে আঁকা বঙ্গবন্ধুর ৪৩ ফুট গুণিতক ৩২ ফুটের বিশাল এক প্রতিকৃতি চিত্রের প্রদর্শনীর আয়োজন করে। শিল্পকলা একাডেমির সহযোগিতায় মুজিববর্ষে এটি কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ দেশের নানা প্রান্তে প্রদর্শন করা হয়েছে। বাংলাদেশের সরকারি বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠানে, অফিস-আদালতে, স্কুল-কলেজে স্থাপন হয়েছে বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক ম্যুরাল।
আমার বিশ্বাস, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যুগে যুগে বাঙালির বংশপরম্পরায় তাঁর নেতৃত্বগুণ, বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের আদর্শ নিয়ে, বাঙালির প্রতি তাঁর সংবেদি অনুভূতি নিয়ে সকল সৃজনে ও ধ্যানে তিনি অনিবার্য হয়ে আরো শক্তিমান হয়ে বারবার আবির্ভূত হবেন।

তথ্যসূত্র

বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শিল্পীসমাজ, বীরেন সোম, চন্দ্রাবতী একাডেমি, ঢাকা ২০১৫।
বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলা : স্বাধীনতার আগে ও পরে, নজরুল ইসলাম। পথরেখা: সমাজ-অর্থনীতি-সাহিত্য-সংস্কৃতিবিষয়ক ভাবনাপত্র, প্রকাশকাল , মার্চ ২০১৩, সম্পাদক নূহ-উল-আলম লেনিন।
ডাকটিকেটে বঙ্গবন্ধু, এটিএম আনোয়ারুল কাদির, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান শততম জন্মস্মারক গ্রন্থ, বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা ও কিশোর বাংলার যৌথ প্রকাশনা, ২০১৯।
কাগজের মুদ্রায় বঙ্গবন্ধু, খালেক বিন জয়েনউদ্দিন, জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান শততম জন্ম স্মারক গ্রন্থ, বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা ও কিশোর বাংলার যৌথ প্রকাশনা. ২০১৯।
জয়নুল আবেদিন : সৃষ্টিশীল জীবনসমগ্র, সৈয়দ আজিজুল হক, প্রথমা প্রকাশ, ২০১৫। এই লেখকের কাছে স্বাধীনতার চার অক্ষর লেখার শিল্পীর নাম ও সেই অক্ষরগুলো নিয়ে মিছিলে অংশগ্রহণকারী চারজনের নাম উল্লেখ করেছেন অন্যতম অংশগ্রহণকারী শিল্পী ফেরদৌসী পিনু।
বাংলাদেশের আধুনিক চিত্রকলা ও তিনজন শিল্পী, ড. আবু তাহের, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ২০০৮।
শিল্পী শাহাবুদ্দিনের সাক্ষাৎকার অবলম্বনে মোহাম্মদ আসাদের লেখা জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান শততম জন্মস্মারক গ্রন্থ, বঙ্গবন্ধু শিশু কিশোর মেলা ও কিশোর বাংলার যৌথ প্রকাশনা, ২০১৯।
জয়নুল আবেদিন : সৃষ্টিশীল জীবনসমগ্র, সৈয়দ আজিজুল হক, প্রথমা প্রকাশ, ২০১৫।
শিল্পী আনোয়ার হোসেন ও শিল্পী আবদুল মান্নানের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য। তাঁরা দু’জনেই পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশ টেলিভিশনের পরিচালক পদ থেকে অবসর নিয়েছেন।

চিত্রকর্ম : শিল্পী শাহাবুদ্দীন

    Leave feedback about this

    • Rating

    PROS

    +
    Add Field

    CONS

    +
    Add Field
    X